যুক্তিবাদী-বিজ্ঞানমনস্কদের লেখালেখি, ম্যাগাজিন ও বইপত্রের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম

এবার থেকে আপনার যুক্তিবাদী লেখাগুলি ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ করুন।

...
পৃথিবীর ইতিহাসে মানব সভ্যতার উত্থান ও পতন

ডাঃ সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

download :150 | price :Rs 350.0 279.0

...
মানবদেহের বিস্ময়

ড. দীপঙ্কর মান্না

download :479 | price :Rs 400.0 320.0

...
কোষ থেকে কসমস: মহাবিশ্বের অনন্ত বিস্ময়

তুহিন সাজ্জাদ শেখ

download :43 | price :Rs 350.0 280.0

...
বিজ্ঞান লিখন বইমেলা ২০২৬

সম্পাদক: পঞ্চানন মণ্ডল, ড. দীপঙ্কর মান্না

download :71 | price :Rs 375.0 300.0

Recent Writings

অহিংসা: প্রচলিত ধারণা থেকে গান্ধীবাদী ব্যাখ্যা -Purnendu Bhowmick
Dec. 9, 2025 | category | views:27 | likes:0 | share: 0 | comments:0

অহিংসার প্রচলিত অর্থ


বৌদ্ধ, জৈন এবং হিন্দু দর্শনে অহিংসা সাধারণত সহিংসতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি হিসেবেই বোঝানো হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে অহিংসা মানে কাউকে আঘাত না করা, প্রাণহানি থেকে বিরত থাকা এবং সংঘাত এড়িয়ে চলা। এই কারণেই অনেক সময় মনে হয়, যুদ্ধ বা চরম সহিংসতার পরিস্থিতিতে অহিংসার কোনো বাস্তব ভূমিকা নেই।


যুদ্ধ ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে অহিংসার সীমাবদ্ধতা


যুদ্ধ মানেই যখন সহিংসতা, তখন অহিংসাকে কেবল সহিংসতার অস্বীকার হিসেবে দেখলে তা কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। বাস্তব দুনিয়ায় সহিংসতা এড়িয়ে চলা সবসময় সম্ভব নয়। এই সীমাবদ্ধতাই প্রচলিত অহিংসার ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।



---


গান্ধীবাদী কাঠামোতে অহিংসার নতুন অর্থ


সহিংসতার বাস্তবতাকে স্বীকার করা


গান্ধীর কাছে অহিংসা মানে সহিংসতা থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। তিনি মনে করতেন, সহিংসতা বিশ্বের স্বাভাবিক বাস্তবতারই একটি অংশ। তাই একে পুরোপুরি অস্বীকার করা অবাস্তব। বরং এই বাস্তবতাকে স্বীকার করেই নৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে হবে।


নিষ্ক্রিয়তা নয়, সক্রিয় নৈতিক অংশগ্রহণ


গান্ধীর অহিংসা কখনোই নিষ্ক্রিয় নয়। অনিবার্য সহিংসতার মুখে দাঁড়িয়ে সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হওয়াই তাঁর ভাবনার মূল কথা। এই অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া নয়, বরং তার ক্ষতিকর প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।



---


সংযম: গান্ধীবাদী অহিংসার কেন্দ্রীয় উপাদান


আবেগ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব


গান্ধী মনে করতেন, সহিংসতার মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষের আবেগ, বিশেষ করে রাগ। রাগ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের দিকে ঠেলে দেয় এবং সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তাই অহিংসার চর্চায় আত্মসংযম অপরিহার্য।


সহিংসতার ভেতরে সংযম নিয়ে অবস্থান


গান্ধী মানুষকে আহ্বান জানান সহিংসতার বাইরে দাঁড়িয়ে নয়, বরং তার ভেতরেই সংযম নিয়ে অবস্থান নিতে। এই নৈতিক সাহসই অহিংসাকে প্রকৃত অর্থে কার্যকর করে তোলে।



---


ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক আইনের সঙ্গে যোগসূত্র


গীতা ও মহাভারতের যুদ্ধনীতি


হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ যেমন গীতা ও মহাভারতে যুদ্ধের কথা বলা হলেও সেখানে সংযম, ন্যায় এবং সীমারেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধকে শেষ উপায় হিসেবে গ্রহণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ধ্বংস এড়ানোর নীতি সেখানে স্পষ্ট।


আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সংযমের ধারণা


আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেও সহিংসতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংযম ও সীমাবদ্ধতার ওপর জোর দেওয়া হয়। গান্ধীবাদী অহিংসা এই প্রাচীন ধর্মীয় ভাবনা ও আধুনিক আইনি কাঠামোর মধ্যে একটি সেতু তৈরি করে।



---


উপসংহার


অহিংসা কেবল সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়; বরং সহিংস বাস্তবতার মধ্যেও মানবিকতা, সংযম ও নৈতিক দায়িত্ব বজায় রাখার দর্শন। গান্ধীর ব্যাখ্যায় অহিংসা আমাদের শেখায়—সবচেয়ে হিংস্র প্রেক্ষাপটেও কীভাবে নৈতিক সাহস ও আত্মসংযমের মাধ্যমে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।

বাঙালির আত্মপরিচয় : ইতিহাস, গৌরব ও অভিযাত্রা -Purnendu BHOWMICK
Sept. 21, 2025 | category | views:354 | likes:40 | share: 0 | comments:0

বাঙালির আত্মপরিচয়ের গল্প শুধু কোনো জাতির ইতিহাস নয়—এ এক অবিরাম যাত্রা, যেখানে জড়িয়ে আছে মানবতা, বিদ্রোহ, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার অনন্ত স্বপ্ন।


সূচনার আলো

এই যাত্রার শুরু হয়েছিল শ্রীচৈতন্যদেবের মানবতাবাদী বাণী দিয়ে। তিনি বলেছিলেন—

“ধর্ম মানে মানুষের সেবা; জীবনের সঙ্গে জীবনের মিলন।”

এই মরমি ভাবনা আজও বাঙালির আত্মার গভীরে অনুরণিত হয়।

নবজাগরণের পথিকৃৎ

রাজা রামমোহন রায় আধুনিকতার প্রথম আলো এনে দিলেন। তিনি সমাজ সংস্কারে যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা বাঙালিকে এক নতুন যুগের দিকে এগিয়ে নিল। তাঁর পথ ধরে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর—শিক্ষা, মানবপ্রেম ও প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা হয়ে।


বিশ্বদরবারে বাংলার পরিচয়

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে পৌঁছে দিলেন বিশ্বমঞ্চে। তাঁর কণ্ঠে বাঙালি পেল বিশ্বজনীনতার পরিচয়। আর সেই ধারাবাহিকতায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম জাগিয়ে তুললেন স্বাধীনতার অগ্নিশিখা। তাঁর কবিতায় প্রতিধ্বনিত হলো বাঙালির সংগ্রাম ও বিদ্রোহী চেতনা।

পূর্ণতার পথে

এই দীর্ঘ যাত্রার পর বাঙালির আত্মপরিচয় পূর্ণতা পেল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। তাঁর হাত ধরে জন্ম নিল স্বাধীন বাংলাদেশ। এক হাজার বছরের স্বপ্ন তখন বাস্তব রূপ পেল—বাঙালি পেল তার নিজস্ব স্বাধীন সত্তা।

বহুমাত্রিক ধারা

বাঙালির আত্মপরিচয় কোনো একক ধারায় সীমাবদ্ধ নয়। বৈদিক যুগের আচার, বৌদ্ধ সহিষ্ণুতা, হিন্দুধর্মের ভক্তি আন্দোলন, সুফিবাদের মরমি দৃষ্টিভঙ্গি—সব মিলেই গড়ে উঠেছে আমাদের বহুত্ববাদী সমাজ। এ কারণেই বাঙালির আত্মপরিচয় এত বৈচিত্র্যময়, এত প্রাণবন্ত।

সমসাময়িক আলোচনায়

সামরুজ ইসলামের প্রবন্ধগ্রন্থ “বাঙালির আত্মপরিচয় ও অভিযাত্রা” এই ইতিহাস ও চেতনাকে নতুনভাবে স্মরণ করিয়েছে। তিনি রাজনীতির মানুষ হলেও তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির গভীর উপলব্ধি। তাঁর মতে—

“বিশ্বজগতের মূল সূত্র হলো বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্যের ভেতর দিয়েই সমাজে আসে পরিবর্তন, সংগ্রাম ও সৌন্দর্যের বিকাশ।”


শেষকথা

আজকের দিনে যখন বিশ্বায়নের প্রভাবে জাতিসত্তা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন বাঙালির আত্মপরিচয়ের এই দীর্ঘ যাত্রা আমাদের পথ দেখায়। এটা শুধু ইতিহাস নয়—এ আমাদের গর্ব, প্রেরণা আর আগামী দিনের দিশা।

ভবিষ্যৎ বলতে আমি মৃত্যু ছাড়া কিছুই দেখি না -RB Prem
Aug. 23, 2025 | মুক্তমনা | views:1603 | likes:30 | share: 3 | comments:0

ব্লগার ও নাস্তিকদের হত্যার ছক ও মৌলবাদের বাংলাদেশ?


আসিফ_মহিউদ্দীন: ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি স্বঘোষিত কট্টরপন্থী নাস্তিক আসিফ মহিউদ্দীন। ঢাকার মতিঝিলে তার অফিসে ছুরিকাঘাতে আহত হন। তিনি অবশ্য সে যাত্রায় বেচে যান।অন্যদিকে চরমপন্থী ইসলামি গ্রুপ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এর দায় স্বীকার করে, ওনারা কারণ হিসেবে এটাই বলে যে "' তুমি ইসলাম ত্যাগ করেছ, তুমি মুসলিম নও ! তুমি কোরানের সমালোচনা করো, আমাদের এটা করতেই হত "" আসিফ মহিউদ্দিন থেকেই শুরু হয় বাংলার বুকে ব্লগার ও নাস্তিকদের হত্যার ছক ???? আসিফ মহিউদ্দিন বিচার পায়নি বরং তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে ????


আহমেদ_রাজিব_হায়দার: ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। আসিফ মহিউদ্দিন কে হত্যা চেস্টা করার ঠিক ১ মাস পর । নাস্তিক ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দার খুন হন। তিনি সেই সময় ঢাকার সন্নিকটে মিরপুরে তার বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন। তার মৃতদেহ যখন পাওয়া যায়, এতটা নির্মমতা যা কখনো আগে কেউ দেখেনি ???? তখন তা দেখে মনে হচ্ছিল সেটা রক্তের বন্যার উপর শায়িত হয়ে রয়েছে।তার ছিন্নভিন্ন দেহকে তার বন্ধুরা প্রথমে চিনতেই পারেনি। মৌলবাদীরা দায় স্বীকার করে এবং কারণ হিসেবে এটা বলে যে "" রাজীব হায়দার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র ফ্রন্ট ইসলামী ছাত্র শিবিরের নিষিদ্ধতা চেয়েছিলেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচারের জন্য সোচ্চার ছিলেন তাই তাকে হত্যা করেছে। ???? প্রকাশ্যে জামাতে ইসলামীর সদস্যরা স্বীকারোক্তি দিল যে আমরা যা করেছি ভালো করেছি। 


সানিউর_রহমান : ২০১৩ সালের ৭ মার্চ । মানে রাজীব হায়দার হত্যার ঠিক ২০ দিন পর । মৌলবাদীরা ০৭ মার্চ রাতে সানিউর রহমান এর উপর আক্রমণ করেন, ঢাকার মিরপুরে পুরবী সিনেমা হলের সামনে আনুমানিক নয়টার দিকে যখন তিনি হাটছিলেন, দুইজন মানুষ চাপাতি হাতে তাকে আকষ্মিক আক্রমণ করেন। সানিউর শাহবাগ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন যেমন: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করতেন। যার দায় স্বীকার করেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। যদিও এ যাত্রায় সানিউর রহমান বেঁচে যায় এবং এ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয় । 


শফিউল_ইসলাম: ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফিউল ইসলাম, একটিবার ভাবতে পারেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাড় দেয়নাই ???? অথচ তার জীবনে তিনি কত ছাত্রছাত্রীকে পড়ালেখা করিয়ে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তায় পাঠিয়েছেন ???? 

 শফিউল ইসলাম রাজশাহী শহরে তার বাড়ি যাওয়ার পথে, কিছু তরুণের দ্বারা ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে গুরুতর আহত হন। তিনি বাউল মতবাদের অনুসারী ছিলেন।তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর, তিনি মৃত্যুবরণ করেন


চরমপন্থী মুসলিম গ্রুপ 'আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২' এর দায় স্বীকার করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওয়েবসাইটে তারা ঘোষণা দেয় যে, "আমাদের মুজাহিদীনরা (যোদ্ধা) আজ এক মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী) কে তার প্রাপ্য সাজা দিয়েছে। বিচার কার্যক্রম এখনো চলমান আছে। ১১ বছর পার হয়ে গেছে কোন কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি ????


ব্লগার_অভিজিৎ_রায় : ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকৌশলী এবং বিখ্যাত বাংলাদেশী ব্লগার অভিজিৎ রায় এবং তার স্ত্রী বন্যা আহমেদ ঢাকাতে দুর্বৃত্তদের দ্বারা চাপাতি হাতে হামলার স্বীকার হন।অভিজিৎ এবং তার স্ত্রী আনুমানিক রাত ৮:৩০ এর দিকে রিকশা করে একুশে বই মেলা থেকে আসছিলেন।তারা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তন এর কাছে আসেন, তখনি দুর্বৃত্ত দ্বারা আক্রমণের স্বীকার হন।

যার দায় স্বীকার করেন জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট । এবং পরিকল্পনাকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল ইসলাম জিয়া যাকে সংক্ষেপে জঙ্গি জিয়া বলা হয় । ব্লগার অভিজিৎ রায় মারা গেল বাংলার বুক থেকে একটি মুক্তচিন্তার অভিভাবক হারিয়ে ফেললাম ????


ওয়াশিকুর_রহমান_বাবু: ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ । মানে অভিজিৎ হত্যার ঠিক ৩২ দিন পর । আরেকজন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু , ঢাকার তেজগাঁওতে অভিজিৎ রায়ের মত খুন হন।ওয়াশিকুর রহমান বাবু কে তারা খুন করেছে কারণ ওয়াশিকুর ইসলামবিরোধী শ্লেষাত্মক লেখা লিখতেন। 

যার দায় স্বীকার করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।


অনন্ত_বিজয়_দাশ: ২০১৫ সালের ১২ মে। মানে ওয়াশিকুর রহমান বাবু ভাই এর মৃত্যুর ঠিক ৪৩ দিন পর ।

অনন্ত বিজয় দাশ প্রকাশ্যে নাস্তিক ব্লগার ছিলেন। ছিলেন চরমপন্থীদের করা তালিকার মধ্যেও। ২০১৫ সালের ১২ মে সিলেটে চারজন মুখোশধারীর হামলায় তিনি নিহত হন। অনন্ত মুক্তমনা ব্লগে লিখতেন, তিনি তিনটি বই লিখেছিলেন, যার একটি ছিল বিজ্ঞানের উপর, একটি বিবর্তনের উপর এবং অপর একটি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লবের উপর। হত্যার পর ইসলামিক স্টেট দায় স্বীকার করে। 


নীলয়_চ্যাটার্জী: ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট। মানে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ এর হত্যার ঠিক ৮৭ দিন পর ছয়জন মানুষ চাপাতি হাতে তার উপর তার নিজের বাসায় হামলা চালায়। ঢাকা সংলগ্ন গোরানে তার বাসা ছিল এবং সেখানে তার মৃত্যু হয়। যার দায় স্বীকার করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া ।

কারণ হিসেবে বলে যে নিলয় ব্লগার ও নাস্তিক ছিল বলে। 


ফয়সাল_আরেফিন_দীপন : ২০১৫ সালের ৩১ শে অক্টোবর মানে ২৪৭ দিন পর (৮ মাস ২ দিন ) জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণাধার ৪৩ বছর বয়সী ফয়সাল আরেফিন দীপন। মৌলবাদীদের দ্বারা ২০১৫ সালের ৩১ শে অক্টোবর মৃত্যুর মুখে ঢলে পরেন। তিনি বিজ্ঞানমনষ্ক-যুক্তিবাদী লেখক অভিজিৎ রায়ের বিশ্বাসের ভাইরাস প্রকাশ করেন। তিনি তার প্রকাশনা রুমেই নিহত হন। একইদিনে অন্য আরেকজন প্রকাশক আহমেদ রশীদ চৌধুরী এবং রনদীপন বসু ও তারেক রহমান নামক দুইজন লেখক অন্য প্রকাশনা রুমে ছুরিকাহত হন। এই তিনজনকেই হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং এদের মধ্যে একজন গুরুতর ভাবে আহত হন।২০২১ সালের ফেব্রুয়ারীতে আদালত দীপন হত্যা মামলায় আট জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যা সর্বপ্রথম বিচার সম্পূর্ণ হয়েছিল । 


আহমেদ_রশীদ_চৌধুরী (টুটুল) :২০১৫ এর সালের ৩১ অক্টোবর প্রায় ২৪৭ দিন ( ৮ মাস ২ দিন ) পর আবারো মাথা চারা দিয়ে ওঠে মৌলবাদী গুষ্টি গুলি । 

৪৩ বছর বয়সী শুদ্ধস্বর প্রকাশনার মালিক আহমেদ রশীদ চৌধুরী ২০১৫ র ফেব্রুয়ারিতে বই মেলায় (এই মাসেই অভিজিৎ রায় মারা গিয়েছেন) নাস্তিক লেখকদের বই প্রকাশ করার জন্য এবং তার ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মৃত্যুর হুমকি পান। ২০১৫ এর ৩১ অক্টোবর গুপ্তহত্যাকারীরা চাপাতি দ্বারা তাকে আক্রমণ করে, তাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। আনসার-আল-ইসলাম এর দায় স্বীকার করে।

কারণ হিসেবে জঙ্গিরা বলে যে সে নাকি নাস্তিকদের বই প্রকাশ করছে এজন্যই তাকে খুন করতে হবে কেননা সে আল্লাহর শত্রু। ????


ড_মুহম্মদ_জাফর_ইকবাল: ২০১৮ সালের ৩ মার্চ। হঠাৎ করে ২ বছর ৪ মাস ৩ দিন পর মৌলবাদী গোষ্ঠী আবারও জেগে উঠলো। 

 মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার । সিলেট শাহ্‌জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এবং বাংলাদেশের গুণী সাহিত্যিক। সাহিত্যাঙ্গনে তার লেখা শিশু-কিশোরদের জন্যই বেশি। এছাড়াও অসংখ্য সায়েন্স ফিকশনের রচয়িতা তিনি।

 ২০১৮ সালের ৩ মার্চ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠান চলার সময় মুহম্মদ জাফর ইকবাল এক আক্রমণে ছুরিকাহত হয়েছিলেন। অধ্যাপক জাফর ইকবালের মাথায়, কাঁধে এবং হাতে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত লেগেছিল। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং তার স্ত্রীকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে একটি ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের নামে মোবাইলে ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল। আপনি একবার চিন্তা করতে পারেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকে তারা ছাড় দেই নাই ???? তাহলে আপনি আমি কতটা নিরাপদ???


বি:দ্রঃ ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হয়তো এর ফল উনি পেয়ে গেছে। 


মনে রাখবেন প্রকৃতি কখনো ক্ষমা করে না। 


#ব্লগার

#নাস্তিক

#আথাইস্ট

#blogger

#atheism

#যুক্তিবাদী

#মুক্তচিন্তক

#লালপিপড়া

#redantbd

#bangladesh

#crime

প্রকৃতির জন্য -Tushar Gorai
July 14, 2025 | পরিবেশ | views:442 | likes:4 | share: 3 | comments:0

বর্তমানে আমরা এমন এক যুগে বাস করি যেখানে দিন-প্রতিদিন আমরা যন্ত্রনির্ভরশীল হয়ে উঠছি । সকালবেলা মোবাইলের অ্যালার্ম শুনে ঘুম থেকে ওঠা এবং চটপট নোটিফিকেশন খুঁজে নেওয়া আমাদের প্রাত্যহিক অভ্যাস হয়ে উঠেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি মোবাইলে আমরা গোটা পৃথিবীকে খুঁজে বেড়াই। সত্যিই কি আমরা খুঁজে পাই? 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিত্যনতুন কান্ডকারখানার হাজারো ঘটনা আমরা দেখছি। সত্যিই কত  কি করে ফেলা সম্ভব সহজ উপায়ে। যে কোন প্রশ্ন করলে চটজলদি উত্তর দিয়ে দেয়। অংক কষতেও পারে। হাজার হাজার বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমের জ্ঞান-বিজ্ঞান কত কম সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রপ্ত করে নিয়েছে। তাহলে মানুষের আর কি কোন প্রয়োজন নেই? যন্ত্র দিয়ে চলবে আমাদের জীবন আর বিশ্ব। এই কি আমাদের কাছে কঠোর বাস্তব। যেভাবে আমরা বছরের পর বছর হেয় করে এসেছি আমাদের মাতৃসম প্রকৃতিকে সেভাবেই কি যন্ত্রও একদিন আমাদের সাথে অপব্যবহার করবে। 

বর্তমানে প্রকৃতি তার স্বচ্ছন্দ হারিয়েছে। মানুষের কার্যকলাপের ফলে প্রকৃতির নিয়ম বিঘ্নিত হয়েছে এবং তার ফলস্বরুপ প্রকৃতি আমাদের ওপর অনিয়মিতভাবে প্রতিক্রিয়া করেছে। সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি হওয়ার ফলে দ্বীপ সংলগ্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাছ কাটার জন্য বাস্তুতন্ত্র ভারসাম্য হারিয়েছে। কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ, জলচক্র, অক্সিজেন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। জল দূষণ, বায়ু দূষণ, মাটি দূষণ গল্প-কবিতার রহস্যময়ী, মনোরম  পরিবেশকে ধ্বংস করে বিষিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাস উষ্ণায়ন আজ চরম অবস্থায় আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। সকল প্রাণীকুল এর প্রভাবের মধ্যে। মনুষ্যসৃষ্ট কারণের জন্যে জনজীবন এবং সকল প্রাণীকুল আজ বিপন্ন। 

মানুষ কত কি না পারে। চারিদিকে যতো দেখি তত অবাক হয়ে যাই বড় বড় ইমারৎ, অত্যাধুনিক যন্ত্র, যুদ্ধাস্ত্র, শিল্প - সংস্কৃতি আরো কত সব সৃষ্টি তার। তবে আমরা কি পারিনা সুন্দর পৃথিবীটাকে পুনর্বাসন দিতে?

চলো আমরা সবে এক হয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই প্রকৃতির জন্য। 



Latest Magazine

...
চেতনার অন্বেষণে নববর্ষ সংখ্যা

চেতনার অন্বেষণে নববর্ষ সংখ্যা

download :1601 | price :Rs-20

Popular Writings

‘মেঘনাথ’ থেকে ‘মেঘনাদ’ -পার্থ সারথি চন্দ্র
Nov. 23, 2024 | জীবনী | views: 9831 | likes:4 | share: 3 | comments:0

হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামির প্রতি বিদ্বেষে নিজের নাম বদলে ফেলেছিলেন মেঘনাদ সাহা।

আজ ভারতীয় বিজ্ঞান সাধনার পথিকৃত মেঘনাদ সাহার ১২৯ তম জন্ম বার্ষিকী। তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা করলেও পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়েও গবেষণা করেছেন। তিনি তাত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে ‘তাপীয় আয়নীকরণ তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠাতা করেন। তার আবিস্কৃত ‘সাহা আয়নীভবন সমীকরণ’ নক্ষত্রের রাসায়নিক ও ভৌত ধর্মগুলো ব্যাখ্যা করতে অপরিহার্য।

শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে নয় - সমগ্র বিজ্ঞানের জগতে আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে উঠেছে যে ক’জন মানুষের মৌলিক তত্ত্বের ওপর - অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা তাঁদের অন্যতম।

 ১৯২০ সালে মেঘনাদ সাহার ‘তাপীয় আয়নায়নের সমীকরণ’ (আয়নাইজেশান ইকুয়েশান) প্রকাশিত হবার পর থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে যত গবেষণা হয়েছে তাদের প্রায় সবগুলোই সাহার সমীকরণ দ্বারা প্রভাবিত। নরওয়ের বিখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী সেভিন রোজল্যান্ড অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ‘থিওরেটিক্যাল এস্ট্রোফিজিক্স’ বইতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন এ’কথা। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের পারমাণবিক তত্ত্ব থেকে শুরু করে বিগ-ব্যাং তত্ত্বের পরীক্ষণ পর্যন্ত সহজ হয়ে উঠেছে যে যন্ত্রের উদ্ভাবনের ফলে - সেই সাইক্লোট্রনের উদ্ভাবক নোবেল বিজয়ী আর্নেস্ট লরেন্স সহ অসংখ্য বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অর্জন করেছেন মেঘনাদ সাহা তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে। নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সামারফেল্ড, নীল্‌স বোর, ম্যাক্স বর্ন, আলবার্ট আইনস্টাইন, আর্থার এডিংটন, এনরিকো ফার্মি, আর্থার কম্পটন প্রমুখ দিকপাল মুগ্ধতার সাথে স্বীকার করেছেন মেঘনাদ সাহার অনন্য প্রতিভার কথা। ভারতবর্ষের বিজ্ঞানচর্চার সাথে বিশ্বের পরিচয় ঘটিয়ে দেয়ার ব্যাপারে এবং ভারতের বিজ্ঞান-গবেষণাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার ব্যাপারে মেঘনাদ সাহার অবদান অনস্বীকার্য।

গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পাবার পাশাপাশি মেঘনাদ সাহা নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন চার বার। ভারতীয় উপমহাদেশে বিশ্বমাপের বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে মেঘনাদ সাহার অক্লান্ত পরিশ্রমে। দেশে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান পড়ানো শুরু হয়েছে মেঘনাদ সাহার হাতে। নিরলস চেষ্টা ও পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স। ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স, ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি, ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ এসোসিয়েশান - সবগুলো সংগঠনই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই মেঘনাদ সাহার ‘টেক্সট বুক অব হিট’ বইটা পড়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মেঘনাদ সাহা মূলত পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। তিনি বিএসসি ও এমএসসি পাশ করেছেন মিশ্র গণিতে। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় পদার্থবিজ্ঞান শুধু শিখেছেন তাই নয় - ক্রমশঃ পৌঁছে গেছেন এই বিষয়ের শিখরে। 

উপমহাদেশে প্রথম সাইক্লোট্রন স্থাপিত হয় মেঘনাদ সাহার প্রচেষ্টায়। অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার পরও থেমে থাকেননি  তিনি।

 সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার লক্ষ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করে গেছেন তিনি। দরিদ্র অশিক্ষিত মা-বাবার সন্তান হয়েও মেধা, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার জোরে একজন মানুষ যে কত বড় হয়ে উঠতে পারেন মেঘনাদ সাহা তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর, সে-বছরও পাঁজিতে ছিল অক্টোবরের আকাশ জুড়ে মেঘ, ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস। এই ৬ অক্টোবর ঢাকার বংশাই নদীর ধারে শ্যাওড়াতলি গ্রামে জগন্নাথ সাহার স্ত্রীর প্রসববেদনা শুরু হল। জগন্নাথ সাহা মুদির দোকানি ও হাঁটুরে ব্যবসায়ী, অবস্থা তেমন সচ্ছল নয়। তবুও কিন্তু এই প্রথম তাঁর সন্তান হচ্ছে না, এর আগে স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দুই ছেলে, দুই মেয়ের জন্ম দিয়েছেন। এদিন প্রসববেদনা উঠতেই গ্রামের ধাই এসে হাজির, সেকালে বসতঘরের বাইরে আলাদা করে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য আঁতুড়ঘর তৈরি করা হতো, তো, সেই ঘরে ভুবনেশ্বরীকে আনা হল। আর তখনই আকাশ উথালপাথাল করে বজ্রবিদ্যুৎ গায়ে মেখে শুরু হল ঝড়। ঝড়ের দাপটে উড়ে গেল আঁতুড়ঘরের খড়ের চাল। সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘনঘটার মধ্যেই জন্ম হল ভারতের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার। ঝড়-বাদলা-মেঘ নিয়ে জন্ম হয়েছিল বলে ঠাকুমা তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘মেঘনাথ’। কিন্তু পরে স্কুলের খাতায় তাঁর এই নাম ঠিক করে রাখা হয় ‘মেঘনাদ’। পরবর্তীকালে মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ তাঁর প্রিয় হয়ে উঠেছিল, আর সব চেয়ে প্রিয় হয়ে উঠেছিল নায়ক ‘মেঘনাদ’। এই প্রিয় হয়ে ওঠাটা শুধু নামের মিলের জন্য নয়, নায়ক মেঘনাদের জেদ, অনমনীয়তা ও বীরত্বের জন্য।

বাবার কোন ইচ্ছেই ছিল না, বলা ভালো জীবনে যে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা প্রয়োজন আছে এমন কোন ভাবনাই ছিল না জগন্নাথের। মুদির ছেলে মুদি হবে, তিনি বুড়ো হলে ছেলেরা তাঁর মতো ব্যবসা সামলাবে, এটাই তো ভবিতব্য, এর আর ভাবাভাবির কী আছে! কাজেই বড়ছেলে জয়নাথের মেট্রিকের গণ্ডি আর পেরনো হল না। ঢাকায় ছুটতে হল ব্যবসায়ীর গদিতে ব্যবসার কাজ শিখতে আর খিদমত খাটতে। মেঘনাদের কপালে এই ভবিতব্যই নাচছিল। পরিবেশে, পরিবারে কোথাও পড়াশোনার আবহাওয়া ছিল না, উৎসাহ দেওয়ারও কেউ ছিল না, তবু পড়ুয়ার স্বভাব নিয়ে কেমন করে যেন জন্ম নিয়েছিলেন মেঘনাদ। পড়তে না পেলে তিনি কান্নাকাটি শুরু করে দিতেন। পড়ার জন্য খুব ভোরে উঠতেন। এসময় ভোররাত্তিরে জোরে জোরে পড়তে গিয়ে বাবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় মারও খেয়েছেন অনেকবার। তবুও, পড়াশোনা থেকে কেউ তাঁর মুখ ফেরাতে পারেনি। এই রকম একটি পরিবেশ থেকেই শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছেশক্তির প্রবলতায় উঠে এসেছিলেন, বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা।

বাবা জগন্নাথ সাহা ও মা ভুবনেশ্বরী দেবীর পঞ্চম সন্তান ছিলেন মেঘনাদ। জগন্নাথ সাহা ছিলেন একজন মুদি। ছোটবেলা থেকেই তাই রীতিমতো আর্থিক অনটেনর মধ্যে তাকে মানুষ হতে হয়েছিল। গ্রামের টোলে মেঘনাদের পড়ালেখার সূচনা হয়। গ্রামটিতে তৃতীয় শ্রেণির উপরে পড়ালেখার কোনও সুযোগ ছিল না৷ কিন্তু মেঘনাদের ইতিহাস আর গণিতের সাফল্যে তার শিক্ষকেরা তাকে একটি ইংরেজি স্কুলে পাঠানোর সুপারিশ করেন এবং গ্রামের মানুষের সহায়তায় তা সফল হয়।

ছোটবেলায় গ্রামের সরস্বতী পুজোয় তিনি দেবীর কাছাকাছি চলে গিয়ে ছুঁয়ে ফেলার অপরাধে এক নির্বোধ গোঁড়া পুরুতের কাছে চরম অপমানিত হয়েছিলেন।

 নিম্নজাতের ধুয়ো তুলে তাঁকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে সমস্ত দেবদেবীর পুজোর ওপর তিনি শ্রদ্ধা হারিয়েছিলেন, এমনকি বিদ্যার দেবীর ওপরেও, কিন্তু বিদ্যার ওপরে নয়।

কিন্তু এক বার সরস্বতী পুজোর দিন বদলে গিয়েছিল সব কিছু। পুজোমণ্ডপে অঞ্জলি দেওয়ায় মেঘনাদের উপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল ব্রাহ্মণ ছাত্ররা। ব্যাপারটা এ রকম যে, তুমি যতই মেধাবৃত্তি পাও, আসলে তো ছোট জাত। তাই ব্রাহ্মণদের সঙ্গে এক আসনে বসার যোগ্যতা অর্জন করতে পারো না। মেঘনাদের ব্রাহ্মণ সহপাঠীদের ভাবগতিক এমনই ছিল। এই ঘটনাই জাতিভেদের বিরূদ্ধে আজীবন লড়াই করার বারুদ ভরে দিয়েছিল মেঘনাদের বুকে, যার ছাপ পড়েছিল তাঁর বিজ্ঞান গবেষণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মতাদর্শে। 

সেই সঙ্গে গড়ে উঠেছিল বৈদিক ধর্মের প্রথা, প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলিকে ব্যবহার করে হাজার হাজার বছর ধরে চলতে থাকা সামাজিক বিভেদের প্রতি বিদ্বেষ। সেই বিদ্বেষ এমনই জায়গায় পৌঁছেছিল যে তিনি পিতৃদত্ত নাম পর্যন্ত বদলে নিয়েছিলেন।

 ১৯৯০ সালের ১৪ জানুয়ারি, স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের কিউরেটর ডেভিড ডিভরকিনকে লেখা এক চিঠিতে মেঘনাদ সাহার বড় ছেলে অজিত সাহা জানিয়েছিলেন, যে দিন তাঁর বাবা জন্মেছিলেন, সারা দিন ধরেই প্রচণ্ড ঝড়-জলের তাণ্ডব। আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী ঝড়-জলের দেবতা দেবরাজ মেঘরাজ ইন্দ্র। তাই দেবরাজ ইন্দ্রের নামানুসারে নবাগত শিশুর নাম রাখা হয়েছিল মেঘনাথ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুদের বৈদিক ধর্মীয় আচরণের গোঁড়ামি মেঘনাথকে এতটাই বিরক্ত করে তুলেছিল যে, তিনি নিজের নাম পাল্টে রেখেছিলেন মেঘনাদ। যিনি ইন্দ্রজিৎ। দেবতা নন, রাক্ষসদের প্রতিনিধি। সেই থেকে গোটা বিশ্বের কাছে তিনি মেঘনাথ নন, মেঘনাদ নামে পরিচিত হন। তাঁর চোখে মেঘনাদ ইন্দ্রজিৎ সমাজের অপমানিত অংশের প্রতিনিধি, যাঁকে অন্যায় ভাবে বধ করেছিল ব্রাহ্মণ সমর্থিত এক ক্ষত্রিয় রাজপুত্র। শুধু বিজ্ঞান বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, নিজের নাম বদলেও মেঘনাদ প্রমাণ করেছিলেন তিনি আসলে ডেমোক্র্যাটিক ক্লাসের প্রতিনিধি, যাদের পিছিয়ে পড়া বলা হয়, জোর করে পিছিয়ে রাখা হয়।

তিনি নাস্তিক হলেও, সেই নাস্তিকতা শুধুই অপমান থেকে আসেনি, এসেছিল জ্ঞান থেকে। তিনি সমস্ত ধর্মের বই আত্মস্থ করে তারপর বিজ্ঞানের স্বচ্ছ দৃষ্টি নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়েছেন, ধর্মের পরস্পরবিরোধী দর্শন নিয়ে নয়।

 তাই আমাদের দীর্ঘদিনের পঞ্জিকার অনুমানমূলক জ্যোতিষগণনার পরিবর্তে তাতে জ্যোতির্বিদ্যার প্রবেশ ঘটিয়ে পঞ্জিকা সংস্কার করেন। বিশ্ববিজ্ঞানের সব কিছুই বেদে আছে, এই কথা যে বেদবাদীরা বলেন, তাঁদের বিরোধীতা করায় চরম প্রতিবাদের মুখে পড়েন মেঘনাদ, কিন্তু তিনি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, বিজ্ঞান আর দর্শন কখনই এক নয়, হতে পারে না। মাইকেলের কাব্যের নায়ক মেঘনাদের মতই কোনদিনই কোন চাপের কাছে, কোন বিরুদ্ধতার কাছে মাথা নত করেননি তিনি।

এরপর তিনি প্রাথমিক পরীক্ষায় তৎকালীন ঢাকা জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করায়। সে সময় মাসিক ৪ টাকার সরকারি বৃত্তি পান, বৃত্তির টাকা ও জয়নাথের পাঠানো পাঁচ টাকা নিয়ে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তির উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন এবং ভর্তি হন। এরপর বৈশ্য সমিতির মাসিক দুই টাকা বৃত্তিও তিনি লাভ করেন।

এদিকে সেই সময় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন চলছিল। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পূর্ব বাংলার গভর্নর স্যার বামফিল্ড ফুলার আসবেন শুনে বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী তার সম্মুখে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী মিছিল করবে নির্ধারণ করে। সে মিছিলে মেঘনাদও যোগ দেন। ফলে পরদিন তাকে স্বদেশী আন্দোলন এ জড়িত থাকার জন্য ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পাশাপাশি তার সরকারী বৃত্তিও বাতিল করা হয়।


পার্শ্ববর্তী কিশোরীলাল জুবিলি হাই স্কুলের একজন শিক্ষক স্বঃপ্রণোদিত হয়ে মেঘনাদকে তাদের স্কুলে ভর্তি বিনাবেতনে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে অধ্যয়ন করেন।

সহপাঠি হিসেবে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও উপরের শ্রেণির প্রশান্ত চন্দ্র মহালনবিশ, আচার্য হিসেবে জগদীশ চন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সান্নিধ্য লাভ করেন।

১৯১৩ সালে গণিতে সম্মানসহ বিএসসি করেন এবং ১৯১৫ সালে ফলিত গণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রথম হন।

মেঘনাদ তার সমস্ত গবেষণা ফলাফল গুলো একত্র করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ডক্টর অব সায়েন্স' ডিগ্রির জন্য আবেদন করেন। তার সব গবেষণা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ১৯১৯ সালে 'ডক্টর অব সায়েন্স' ডিগ্রি প্রদান করে। একইবছর মেঘনাদ প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। যার ফলে তিনি ইংল্যান্ড ও জার্মানীতে গবেষণার সুযোগ পান।

১৯১৬ সালে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিজ্ঞান কলেজ চালু করার পর সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদ উভয়েই গণিত বিভাগের যোগ দিতে বলেন দেন। যদিও পরবর্তী কালে দুজনেই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে চলে যান। সেখানে চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন পালিত অধ্যাপক হিসেবে পরবর্তীতে যোগ দেন। এরপর ১৯১৯ সালে তিনি প্রথম পাঁচ মাস লণ্ডনে বিজ্ঞানী আলফ্রেড ফাউলারের পরীক্ষাগারে এবং পরবর্তীতে বার্লিনে ওয়াস্টার নার্নস্টের সাথে কাজ করেন। দুইবছর ধরে দেশের বাইরে গবেষণা করার পর মেঘমাদ সাহা ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে খয়রা অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য কোনো বরাদ্দ সেসময় না থাকায় তিনি ১৯২৩ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তিনি ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। 

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গণিতবিদ অমিয় চরন ব্যানার্জি এর সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৫ বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি বিভাগটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন। এরপর তিনি মারা যাবার আগে অব্দি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর বিজ্ঞান বিভাগের ডিন হিসেবে দ্বায়িত্বপালন করেছেন।

১৯১৭ সাল। ব্রিটিশশাসিত ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড চেম্সফোর্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন স্থাপন করলেন। কমিশনের প্রধান হিসেবে বসানো হল এম ই স্যাডলারকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন কেমন চলছে তার রিপোর্ট তৈরি করাই স্যাডলারের দায়িত্ব। যদিও কমিশনের আসল উদ্দেশ্য অন্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরমহলে নজর রাখা। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের পর থেকেই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্রিটিশ সরকারের চোখে বিপ্লবী তৈরির আখড়া। স্যাডলার একটা প্রশ্নপত্র তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী মিলিয়ে মোট ৬৭১ জনকে বিলি করেন। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে আরও দাবিদাওয়া আলাদা করে লিখে জানানো যাবে। স্যাডলার জানতেন, উত্তরপত্রে কড়া নজর থাকবে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের।

উত্তরদাতাদের মধ্যে একজনের উত্তরপত্র ছিল বেশ দীর্ঘ। পঠনপাঠনের সমস্যা ছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যময় পরিবেশের দিকেও আঙুল তুলেছিলেন। উত্তরপত্রে লেখা ছিল, “যদি বিশ্ববিদ্যালয়কে আবাসিক করে তোলার কথা ভাবা হয় এবং যথাযথ হস্টেলের ব্যবস্থা করা হয় তা হলে ‘ডেমোক্র্যাটিক ক্লাস’ বা গণতান্ত্রিক শ্রেণির (আমি তাদেরই গণতান্ত্রিক শ্রেণি বলে অভিহিত করছি, যাদের পিছিয়ে পড়া শ্রেণি বলা হয়) কথা ভাবতেই হবে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যে লাগোয়া হস্টেল রয়েছে, তাতে তথাকথিত উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণদের মৌরসিপাট্টা চলছে। সেই সঙ্গে যোগ দিয়েছে কায়স্থ ও বৈদ্য ছাত্রেরা। কোনও গণতান্ত্রিক শ্রেণির ছাত্রকেই ব্রাহ্মণ বা কায়স্থ ছাত্র এক ঘরে মেনে নেয় না বা একসঙ্গে খেতে বসলেও আপত্তি জানানো হয়।” উত্তরদাতা বছর কুড়ির এক লেকচারার মেঘনাদ সাহা। মাত্র দু’বছর আগে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন এবং স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে এসেছেন।


কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন রিপোর্টে মেঘনাদ সাহার মতোই পিছিয়ে পড়া বা ‘নিচু জাত’-এর ছাত্রদের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। কিন্তু তাঁর ও মেঘনাদের দৃষ্টিভঙ্গির বুনিয়াদি পার্থক্য ছিল, যা বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক। ব্রজেন্দ্রনাথ তাঁর রিপোর্টে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য আলাদা আর্থিক তহবিল গড়ার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। 

শীলের রিপোর্টে যুগ্গি, বারিক, সুবর্ণবণিক, নমঃশূদ্র, সাহাদের ‘ডিপ্রেসড ক্লাস’ বা কোথাও ‘লোয়ার কাস্ট’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

 সেখানে মেঘনাদের রিপোর্টে এরা প্রত্যেকেই এক ছাতার তলায়, গণতান্ত্রিক শ্রেণি। নিজের রিপোর্টে পৃথক তহবিল গড়ে তোলাকে একদমই প্রশ্রয় দেননি মেঘনাদ। তিনি সবার সমান অধিকারের প3ক্ষে। মেঘনাদের দৃষ্টিভঙ্গি দেশের বর্তমান ভর্তুকিপুষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থার সরাসরি বিপক্ষে। তিনি সেই সময়েই বুঝেছিলেন, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের বিভেদ টেনে এবং ভর্তুকি দিয়ে কোনও এক বিশেষ শ্রেণির উন্নতির সম্ভাবনাকে মেরে ফেলায় দেশের সত্যিকারের উন্নতি সম্ভব নয়। 

২৮ বছর পরে, দেশভাগের সময়েও মেঘনাদ সাহার গলায় ধ্বনিত হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন রিপোর্টেরই সুর। তখন তিনি আর ২০ বছরের লেকচারার নন। প্রথিতযশা বিজ্ঞানী। কিন্তু ল্যাবরেটরির বাইরে এসেও তিনি শুনিয়েছিলেন তাঁর সাম্যের গান। স্বাধীনতার বছর দুই আগে সায়েন্স অ্যান্ড কালচার পত্রিকায় মেঘনাদ লেখেন, “দেশভাগের ফলে ভারতে থাকা মুসলমানরা হিন্দুরাজের পদদলিত হয়ে থাকবে এবং সংখ্যালঘু শ্রেণিতে পরিণত হবে বলেই মনে হয়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকেও একটা কড়া জাতীয়তাবাদের রেখা দিয়ে ভাগ করে দেওয়া হবে, যা সংখ্যালঘু শ্রেণির মধ্যে ডেকে আনবে সীমাহীন দারিদ্র্য।” পরের বছর ফের একই পত্রিকায় লেখেন, 

“সত্যিকারের স্বাধীনতা পেতে হলে, অশিক্ষা থেকে মুক্তি পেতে হলে, রোগ-জরা-ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে যেতে হবে।”

 ‘আওয়ার ন্যাশনাল ক্রাইসিস’ শিরোনামের সেই প্রবন্ধে মেঘনাদের মূল বক্তব্য ছিল, সবাইকে কর্মযজ্ঞে শামিল করতে হবে, তা না হলে প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না। 

মেঘনাদ এবং সত্যেন বোস যুগ্মভাবে সর্বপ্রথম আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সহ তার বিভিন্ন নিবন্ধ ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। আইনস্টাইনের ১৯০৫ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত মোট যতগুলি নিবন্ধ জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল তার সবগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ শুরু করেন মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তাদের এই অনুবাদ ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'প্রিন্সিপাল্‌স অব রিলেটিভিটি' নামে প্রকাশিত হয়। অনূদিত বইটির ভূমিকা লেখেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। ১৯৭৯ সালে আইনস্টাইনের জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বলা হয় আইনস্টাইনের নিবন্ধগুলির প্রথম অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল জাপানে।

এই ভুল সংশোধন করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরের চেষ্টায় আইনস্টাইনের রচনার প্রথম অনুবাদের স্বীকৃতি পান সাহা ও বসু। তাদের এই অনূদিত প্রিন্সিপাল্‌স অব রিলেটিভিটির একটি প্রতিলিপি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনস্টাইন আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। সাহা ও বসুর এই অনুবাদ সর্বপ্রথম ইংরেজিতে অনুবাদ শুধু নয়, সারাবিশ্বে এটিই আইনস্টাইনের রচনার প্রথম অনুবাদ।

১৯৩০ সালে ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী দেবেন্দ্র মোহন বসু এবং শিশির কুমার মিত্র মেঘনাদ সাহাকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনীত করেন।

নোবেল কমিটি মেঘনাদ সাহার কাজকে পদার্থবিজ্ঞানের একটি উল্ল্যেখযোগ্য প্রয়োগ হিসেবে বিবেচনা করলেও এটি “আবিষ্কার” নয় বলে তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি।

 মেঘনাদ সাহাকে ১৯৩৭ সালে এবং ১৯৪০ সালে আর্থার কম্পটন এবং ১৯৩৯, ১৯৫১ ও ১৯৫৫ সালে শিশির কুমার মিত্র আবারও মনোনীত করলেও নোবেল কমিটি তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে৷

তিনি ভারতে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে আধুনিক গবেষণার জন্য ১৯৫০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স প্রতিষ্ঠা করেন। পদার্থবিজ্ঞানে তার অবদানের জন্য ১৯২৭ সালে লন্ডনের রয়াল সোসাইটি তাকে এফআরএস নির্বাচিত করে।


তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা করলেও পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়েও গবেষণা করেছেন। তিনি তাত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে 'তাপীয় আয়নীকরণ তত্ত্ব' প্রতিষ্ঠাতা করেন। তার আবিস্কৃত 'সাহা আয়নীভবন সমীকরণ' নক্ষত্রের রাসায়নিক ও ভৌত ধর্মগুলো ব্যাখ্যা করতে অপরিহার্য।

তিনি ও তার সহপাঠী এবং সহকর্মী সত্যেন্দ্রনাথ বসু সর্বপ্রথম আইনস্টাইনের 'স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি' জার্মান থেকে ইংরাজি অনুবাদ করেন যা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। এছাড়া ভারতের নদী নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি ভারতে পদার্থবিদ্যার বিকাশ ও প্রসারের জন্য ১৯৩১ সালে 'ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্স, ইন্ডিয়া' প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও ১৯৩৪ সালে ভারতে পদার্থবিজ্ঞানীদের সংগঠন 'ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি'ও প্রতিষ্ঠা করেন। তার উদ্যোগেই ভারতে 'ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট অব সায়েন্স' এর সূচনা হয়, যা বর্তমানে 'ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট অব টেকনোলজি' (আই. আই. টি.) নামে বর্তমানে পরিচিত।

১৯৫২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী রূপে ভারতীয় লোকসভার কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্র (বর্তমানে কলকাতা উত্তর লোকসভা কেন্দ্র) হতে নির্বাচিত সাংসদ হন।

কিন্তু কেমন ছিলেন ব্যক্তি মেঘনাদ? তাঁর ছাত্র ব্রজেন্দ্রকিশোর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা থেকে জানা যায়, স্পষ্টবক্তা হিসেবে ‘কুখ্যাতি’ ছিল মেঘনাদের। আসলে কাজের জায়গায় কোনও রকম কুঁড়েমি তিনি পছন্দ করতেন না। ছাত্ররা তাঁকে ভয় পেত। 

কিন্তু কড়া শিক্ষকের ভিতরে লুকিয়ে ছিল এক ছাত্রদরদি নরম মনের মানুষ। ব্রজেন্দ্রকিশোরের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়,

 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন কলকাতায় জাপানি বোমাতঙ্ক ছড়িয়েছে, অধ্যাপক সাহার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করেছিলেন তিনি। সকালে চা খেয়ে পড়াশোনা, গবেষণার কাজ শুরু করায় অভ্যস্ত ছিলেন ব্রজেন্দ্রকিশোর। কিন্তু অধ্যাপক সাহার বাড়ির রান্নার লোক অনেকটাই দেরি করে আসতেন। ছাত্রের অসুবিধের কথা ভেবে নিজে হাতে চা তৈরি করে খাওয়াতেন তিনি। তবে হঠাৎ করে রেগে যাওয়াও ছিল মেঘনাদের স্বভাবের একটি অঙ্গ। আসলে, অসম্ভব প্রতিভার অধিকারী মানুষটি সারা জীবনই বঞ্চনা ও গঞ্জনার শিকার - যা প্রভাব ফেলেছিল তাঁর স্বভাবেও। এমনকি নিজের বিবাহেও সহ্য করতে হয়েছিল গঞ্জনা। 

মেঘনাদ সাহার বউমা বিশ্ববাণী সাহার লেখা থেকে জানা যায়, ১৯১৮ সালে রাধারাণী রায়ের সঙ্গে বিবাহ হয় মেঘনাদের। বিয়েতে তাঁর পাঞ্জাবির তলা দিয়ে ছেঁড়া গেঞ্জি দেখা যাচ্ছিল। পাত্রের দুর্দশা দেখে বিয়েতে প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়েছিলেন রাধারাণীর ঠাকুমা। আসলে গবেষণায় মগ্ন মানুষটি তখনও জীবনে বিশেষ টাকাকড়ি করে উঠতে পারেননি। কিন্তু তা বলে বিদ্যাচর্চায় খামতি থাকেনি। গবেষণাগার থেকে ফিরেও বইয়ের জগতে ডুবে যেতেই পছন্দ করতেন। বাড়িতে ছিল নিজস্ব লাইব্রেরি। রবীন্দ্রনাথ ও শেক্সপিয়রের ভক্ত ছিলেন। 

মেঘনাদ সাহার তৃতীয় কন্যা চিত্রা রায় জানিয়েছেন, অধ্যাপক সাহা যখন গবেষণার কাজ সেরে বাড়িতে ফিরতেন, শেক্সপিয়রের ‘কমেডি অব এররস’ থেকে পড়ে শোনাতে হত তাঁকে। অধ্যাপক সাহার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে জায়গা পেয়েছিল বিশ্বসাহিত্যের বিশাল সম্ভার - যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ম্যাক্সিম গোর্কি, নুট হামসুন, লিয়ো টলস্টয়ের লেখা বইপত্র। অধ্যাপক সাহার এই সাহিত্যপ্রেম দানা বেঁধেছিল ইলাহাবাদে থাকাকালীন। ইলাহাবাদে সেই সময়ে একটা বাংলা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যার মধ্যমণি ছিলেন প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। এ ছাড়াও ছিলেন যোগেনচন্দ্র গুপ্ত। এঁদের সান্নিধ্য অধ্যাপক সাহার কাছে ছিল বিজ্ঞান ও রাজনীতির বাইরে এক ঝলক মুক্ত বাতাসের মতো। সাহিত্য পাঠ ও চর্চা ছাড়াও দেশবিদেশের পত্রিকা সংগ্রহে তাঁর উৎসাহ ছিল। বাড়ির ছোটদের ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক ম্যাগাজ়িন থেকে বিভিন্ন ছবি দেখাতেন, অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি পড়ে শোনাতেন। ছোটদের জন্য কলমও ধরেছিলেন কয়েক বার, যা প্রকাশিত হয় যোগেনচন্দ্র গুপ্তের ‘শিশুভারতী’ পত্রিকায়। সাহিত্য ছাড়াও অধ্যাপক সাহা উৎসাহী ছিলেন ভাষাতত্ত্ব চর্চায়। বিদেশি ভাষা শেখার প্রতি তাঁর আকর্ষণের সূত্রপাত ঢাকার স্কুল থেকে। ছাত্রাবস্থায় ঢাকা ব্যাপটিস্ট মিশন আয়োজিত এক পরীক্ষায় তিনি সংস্কৃত, বাংলা ও ইংরেজিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন। ইন্টারমিডিয়েটে জার্মান ভাষার সঙ্গে পরিচয়। এর পরে সারা জীবনই যখন সুযোগ পেয়েছেন বিভিন্ন ভাষা চর্চা করে গিয়েছেন। রমাপ্রসাদ চন্দ্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিরজা শঙ্কর গুহর সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কৃতির ভাষা চর্চা করতেন নিয়মিত। সেই বিষয়ে একাধিক বই সংগ্রহ করাটাও তাঁর নেশা ছিল। 

‘দেশ’ পত্রিকাকে (১৯৯৩, ৯ অক্টোবর সংখ্যা) দেওয়া সাক্ষাৎকারে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পণ্ডিত ডেভিড ডিভরকিন জানিয়েছিলেন, মেঘনাদ সাহাকে পদার্থবিদ্যায় নোবেল প্রাইজ়ের জন্য মনোনীত করার চেষ্টা করেছিলেন ১৯২৭-এর পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী আর্থার কম্পটন। কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণায় ভাটা পড়ার কারণেই হোক বা দেশীয় বিজ্ঞানীদের বিরোধিতায়, নোবেল প্রাইজ় তিনি পাননি। তাঁর জীবনযাপনের দিকে চোখ রাখলে বোঝা যায়, নোবেল পুরস্কারের মুখাপেক্ষীও ছিলেন না তিনি। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল বিজ্ঞানের হাত ধরে জাতিভেদ, অসাম্যকে জয় করা এবং তথাকথিত উঁচু তলার মানুষদের তৈরি করা বিভাজন রেখাকে মুছে ফেলা। আমৃত্যু সেই কাজটাই করে গিয়েছেন মেঘনাদ নিষ্ঠার সঙ্গে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিজ্ঞান সংগঠক মেঘনাদকে না পেলে ভারত বিজ্ঞান গবেষণায় সাবালক হয়ে উঠত না।

কংগ্রেসের চরকা কাটার নীতির বিরোধিতার কারণে দেশের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল ছিল না, যা বাধা সৃষ্টি করেছিল মেঘনাদ সাহার কর্মকাণ্ডে। স্বাধীনতার পরে, ভারত সরকারের পারমাণবিক শক্তি কমিশনেও তাঁর মতামত অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান সংগঠক হিসেবে নিজের কাজ করে গিয়েছেন তিনি। এশিয়া মহাদেশের প্রথম সাইক্লোট্রন যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করা, প্রথম ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ তৈরিও তাঁর সাহসী পদক্ষেপের পরিচয় বহন করে। এ ছাড়াও দেশীয় উপাদানে নিজের বিটা স্পেকট্রোমিটারও তৈরি করেছিলেন অধ্যাপক সাহা, যার সাহায্যে ভারতীয় খনিজ পদার্থের তেজস্ক্রিয়তা জরিপ করা, এ দেশে জীববিজ্ঞানের গবেষণাকেন্দ্রিক বিজ্ঞান বা নিউক্লিয়ার সায়েন্সের প্রয়োগ তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়। 

১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আচমকাই মৃত্যু এসে থামিয়ে দিয়েছিল এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। ছাত্র ব্রজেন্দ্রকিশোরের লেখায় আছে, ‘ড. জ্ঞান ঘোষের ফোনে অধ্যাপক সাহার অসুস্থতার খবর পাই। ওয়েলিংটন নার্সিংহোমে পৌঁছে জানতে পারি সব শেষ।’ 


বিজ্ঞানে ব্যক্তিগত সাফল্যের ঊর্ধ্বে মেঘনাদ স্থান দিয়েছিলেন দেশকে, জাতিকে, দেশের অর্থনীতিকে। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, তিনি সময়ের আগে জন্মেছিলেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত হয়ে উঠতেই পারেনি তৎকালীন ভারত। তাই বিজ্ঞান বা রাজনীতি, সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী। একটা বিষয় লক্ষ করার মতো, ভারতীয় বিজ্ঞানের তিন নক্ষত্র প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে আচার্য হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু মেঘনাদ সাহা আজও শুধুই অধ্যাপক সাহা। এ ক্ষেত্রেও তিনি ডেমোক্র্যাটিক ক্লাসের প্রতিনিধি, যাদের ‘পিছিয়ে পড়া’ বলা হয়, জোর করে পিছিয়ে রাখা হয়।

বিপ্লবী পদার্থ বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা - প্রতিবাদের এক শক্তিশেলের নাম। বিজ্ঞানে ব্যক্তিগত সাফল্যের ঊর্ধ্বে মেঘনাদ সাহা স্থান দিয়েছিলেন দেশকে, জাতিকে, দেশের অর্থনীতিকে। ছয়বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। সারাজীবন লড়াই করেছেন জাতপাত, দারিদ্রের বিরুদ্ধে। আজ মেঘনাদ সাহার জন্মদিবস। আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।

তথ‍্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার: আনন্দবাজার পত্রিকা, চ‍্যানেল হিন্দুস্তান, কোলকাতা ২৪×৭ ডট কম, ব্লগ ডট মুক্তমনা ডট কম, উইকিপিডিয়া, ড. চিত্রা রায়, ‘ডিসপার্সড রেডিয়েন্স, কাস্ট, জেন্ডার অ্যান্ড মডার্ন সায়েন্স ইন ইন্ডিয়া’ : আভা শূর, ‘মেঘনাদ সাহা : দ্য সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড দ্য ইনস্টিটিউট বিল্ডার’: শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়, ইন্ডিয়ান জার্নাল অব হিস্ট্রি অব সায়েন্স - ২৯ (১), ১৯৯৪, দেশ পত্রিকা - ১৯৯৩, ৯ অক্টোবর সংখ্যা।

দেহদান মানবতার এক অঙ্গীকার -পৃথ্বীশ ঘোষ
Nov. 20, 2024 | সামাজিক ইস্যু | views: 9800 | likes:455 | share: 524 | comments:0

দেহদান ও চক্ষু দান এর কথা মনে পড়তেই প্রথম যে বাধার সম্মুখীন হই আমরা তা হল আজন্ম লালিত কিছু ধর্মীয় কুসংস্কার। যদি কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দান করি পুনর্জন্ম ( rebirth) হলে সেই অঙ্গ ছাড়াই প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মাতে পারে। তাছাড়া ধর্মীয় বাধা সামাজিক বাধা এগুলো এক এক করে আসে। যদি এসব বাধা  কাটিয়ে কেউ ইচ্ছে করলেই অনায়াসে এই মহৎ দানে ব্রতী হতে পারে। মরণোত্তর দেহদান হল মৃত্যুর পর শবদেহ ধর্মীয় প্রথাসিদ্ধ মতে সৎকার না করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থে দান করা।

যাঁর মৃতদেহ তিনি কিন্তু নিজে এই দান করতে পারে না, সেটাই স্বাভাবিক। কারন মৃত্যুর পর তিনি দান করবেন কি করে? কোন ব্যক্তি জীবিতকালে শুধুমাত্র তাঁর এই ইচ্ছার কথা অঙ্গীকারের মাধ্যমে জানিয়ে রাখতে পারেন শুধু। তাঁর ইচ্ছাপূরণের দায়টা কিন্তু নিকটজনের। আর এই ইচ্ছাপুরণটা যাতে হয় সেক্ষত্রে অঙ্গীকারকের একটা ভূমিকা আছে। তা হল এই অঙ্গীকারের বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। যা দিয়ে সে নিকটজনকে মোটিভেটেড করতে পারবে।

আমি 2010 সালেই গণদর্পন এর মাধ্যমে এই অঙ্গীকার করেছিলাম। আপনার প্রিয়জন যার ইতিমধ্যেই ব্রেন ডেথ হয়েছে তার সুস্থ সবল অঙ্গ দিয়ে অন্য আর একজন ভালোভাবে বাঁচতে পারবে। বলতে গেলে তিনি অন্য একজনের মধ্যেই স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবেন। আপনার প্রিয়জনের দুটি চোখ দুজন অন্ধ মানুষ কে পৃথিবীর আলো দেখাতে পারে । তাছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রদের গবেষণায় নানাবিধ সাহায্য হয়ে থাকে।  যদি ইতিহাসের পাতায় ফিরে যাই পৃথিবীর প্রথম মরণোত্তর দেহদান হয় 1832 সালে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত চিন্তাবিদ জেরমে বেন্থাম এর। ভারতে 1956 সালে পুনের শিক্ষাবিদ পান্ডুরঙ শ্রীধর আপ্তে। পশ্চিমবঙ্গে 1990 সালের 18 ই জানুয়ারি সুকুমার হোমচৌধুরী।  পূর্ব অঙ্গীকার মতো সুকুমার হোমচৌধুরীর মরদেহ আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে দান করা হয়।

1905 সালের 7 ডিসেম্বর প্রত্যঙ্গদানে ঘটে যুগান্তকারী ঘটনা। ঘটনাটি ঘটে চেকশ্লোভাকিয়ায় চক্ষু চিকিৎসক এডোয়ার্ড কনরাড জার্ম (Eduard conarad Zirm) হাত ধরে। 45 বছরের অ্যালোস গ্লোগা (Alois Gloga) কর্ণিয়াজনিত কারণে দুটি চোখেই দৃষ্টিহীন। তখন এডোয়ার্ড কনরাড জার্ম 11 বছরের কার্ল ব্রুয়ের ( Karl Brauer) একটি চোখের কর্ণিয়া নিয়ে অ্যালোস গ্লোগার চোখে প্রতিস্থাপন করেন। হ্যাঁ, এই কর্ণিয়া প্রতিস্থাপন ছিল জীবিত মানুষের থেকে নিয়ে। আর এই ছিল একমাত্র প্রথম ও শেষ জীবিত কারো থেকে কর্ণিয়া সংগ্রহ করে কর্ণিয়াজনিত কারনে কোন ব্যাক্তিকে কর্ণিয়া প্রতিস্থাপন। দক্ষিণ ভারতের বিজ্ঞান আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ আব্রাহাম কোভুর ও আক্কা কোভুর। তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী তাঁদের মৃত্যুর পর তাদের মরদেহও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে ব্যবহৃত হয়। ঘটনাটি ঘটে 1970 সালে। 1987 সালে শ্রীলঙ্কায় এল টি টি ই-র নেতা দিলীপ থেলাপ্পান অনশন চলাকালীন মারা যান। উনার অঙ্গীকার অনুযায়ী উনার মৃতদেহ জাফনা মেডিক্যাল কলেজে দান করা হয়। 

কোভিড মহামারীর মধ্যেই গনদর্পন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও দেহদান আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্রজ রায়ের করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর (13,may,2021) পর প্যাথলজিক্যাল অটোপসি করা হয়। এই প্রথম পূর্ব ভারতে কোনও কোভিডে মৃত ব্যক্তির প্যাথোলজিক্যাল অটোপসি হয় বলে আরজি কর হাসপাতাল সূত্রে দাবি। মৃত্যুর সঠিক কারণ কী, কোভিডের কারণে মৃতের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, প্যাথলজিক্যাল অটোপসির মাধ্যমে তা জানা সম্ভব।

1994 সালে ভারত সরকার ‘দ্য ট্রান্সপ্লানটেশন অব হিউম্যান অরগ্যান অ্যাক্ট – 1994’ আইন চালু করেন। এই আইনের ফলেই সাধারণ মৃত্যুর পাশাপাশি মস্তিষ্কের মৃত্যুও স্বীকৃতি পায়। এরফলে যান্ত্রিকভাবে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের কাজ চালু রেখে মৃতের দেহ থেকে প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনে রাস্তা সুগম হয়। 1995 সালে আমাদের রাজ্য এই আইন গ্রহণ করে। কিন্তু 2010 সাল পর্যন্ত আমাদের রাজ্যে শুধুমাত্র কর্ণিয়া ছাড়া মৃতদেহ থেকে অন্যকোন অরগ্যান সংগ্রহ ও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয় নি। ২০১০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী এস এস কে এম হাসপাতালে জয়দেব পালের মৃতদেহ থেকে লিভার সংগ্রহ করে সিরোসিস অব লিভারে আক্রান্ত জয়তী চট্টোপাধ্যায়ের দেহ প্রতিস্থাপিত হয়। নদীয়ার দীনেশচন্দ্র মোদক হঠাৎই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যান। তখন উনার একমাত্র কন্যা বন্দনা মোদকও বিকল দুটি কিডনী নিয়ে মৃত্যুর দিনের অপেক্ষায়। তখন চিকিৎসারত চিকিৎসক ডাঃ এম সি শীল মৃত দীনেশচন্দ মোদকের স্ত্রী লক্ষ্মীদেবীকে জানান যে উনার স্বামীকে ফিরে পাবেন না কিন্তু আপনি আপনার মেয়েকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারেন যদি দীনেশবাবুর মৃতদেহ থেকে কিডনী বন্দনার দেহে প্রতিস্থাপনের অনুমতি দেন। লক্ষ্মীদেবী অনুমতি দেন। বন্দনা আজো বেঁচে আছে আমার আপনার মতই। 


সাধারণ মৃত্যুর পর যেসব অরগ্যান নেওয়া সম্ভব


১) চোখ (গ্লুকোমা, ক্যানসার, হেপাটাইটিস, এইচ আই ভি বা সেপটোসেমিয়া থাকলে সম্ভব নয়) (একমাত্র কর্ণিয়া জনিত কারনেই দৃষ্টিহীন হলেই তাকে দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব) (যদি কেউ কর্ণিয়াজনিত কারণ ছাড়া অন্যকারনে দৃষ্টিহীন হয় তবে সেই দৃষ্টিহীন ব্যাক্তিও চোখ দান করতে পারেন)। আমাদের দেশের আবহাওয়া অনুযায়ী ৪ ঘন্টার মধ্যে।

২) ৪ ঘন্টার মধ্যে অস্থি, ত্বক, ইয়ারড্রাম ও ইয়ার বোন।

৩) ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে কিডনী।


কিছু অরগ্যান যা রক্ত সঞ্চালন অবস্থায় সংগ্রহ করতে হয়।


সেগুলো হচ্ছে ১) কিডনী, ২) হার্ট ও হার্ট ভালভ, ৩) প্যাঙক্রিয়াস, ৪) অস্থিমজ্জা, ৫) রক্ত ও অনান্য সব।


এবার চক্ষুদান নিয়ে কিছু কথা বলি আপনার চোখে দৃষ্টি পাবে দৃষ্টিহীন কেউ। এই মহত কাজটি অনেকেই মৃত্যুর আগে নির্দ্বিধায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। কিন্তু অনেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিস্তর ভাবনাচিন্তা করে। কিন্তু ওই যে নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আর হয়ে ওঠেনা।

উল্লেখ্য, আমাদের দেশে চোখ দানের

প্রয়জনীয়তা রয়েছে। তবে পাশাপাশি, আসল প্রক্রিয়া, উপকারিতা, কল্পনা, মিথ এবং ঘটনাগুলি সম্পর্কে ভুলধারণা রয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে ভারতে আনুমানিক ১৫ মিলিয়ন মানুষ দৃষ্টিহীন এবং ৩০ মিলিয়ন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে লড়ে চলেছে।  ডাক্তার হর্ষবর্ধন ঘোড়পাদে বলেছেন  ভারতে চোখের দান সম্পর্কে সচেতনতা প্রচার হয়না। কারণ এর চারপাশে বহু মিথ ও কুসংস্কার রয়েছে; চোখ দান সম্পর্কে মানুষকে আরও সচেতন করা উচিত। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে বিভিন্ন বিজ্ঞান ক্লাব গুলি । সেই সঙ্গে আমরা যতটা রক্তদানে আগ্রহী তার সিকিভাগ যদি এই ব্যাপারে উৎসাহী হই তাহলে সমাজের পক্ষেই মঙ্গল হবে । এখন তো বিভিন্ন ক্লাব তাদের রক্তদান কর্মসূচির মধ্যেই দেহদান ও চক্ষুদান কে অন্তর্ভুক্ত করছে আমি বলাগড়ে ব্লকে দেখেছি ।


●চোখ দানের পিছনে যে ভুল ধারণা রয়েছে দেশেজুড়ে তা হল -

◆চোখের দান করলে পরের জন্মে চোখ হবে না। মুখের আদল নষ্ট হয়ে যাবে। মৃত্যুর পরও যে জন্ম হয়, তার নিশ্চিত পরীক্ষামূলক তথ্য নেই। তাছাড়া বিভিন্ন কারনে অনেক সময় জীনগত কারনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়।

◆সঠিক তথ্য- চক্ষু দান করলে মুখের চেহারা নষ্ট হয় না। কর্নিয়া নেওয়া হয়। যখন চোখ বন্ধ থাকে , তখন স্বাভাবিকই থাকবে।

●কোনও ব্যক্তি জীবিত থাকাকালীন তাদের চোখ দান করতে পারে।

◆সঠিক তথ্য: না। কিডনি বা যকৃতের কিছু অংশ জীবিত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তিকে দান করা যেতে পারে, তবে মৃত্যুর পরে চোখ দান করা হয়। আপনি জীবিত থাকাকালীন আপনার চোখ দান করার শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে অঙ্গীকার করতে পারেন।

● চক্ষু দান সমস্ত অন্ধ মানুষকে সাহায্য করতে পারে।

◆সঠিক তথ্য: শুধুমাত্র কর্নিয়ার অস্বচ্ছ ব্যক্তিরাই উপকৃত হতে পারে, অন্যদিকে রেটিনা বা অপটিক নার্ভের জন্য অন্ধত্ব এলে তারা চোখ দান থেকে উপকৃত হবে না।

● আপনি যদি রেটিনার রোগে ভোগেন বা আপনার চোখে শল্যচিকিৎসা হয়ে থাকে, আপনি দাতা হতে পারবেন না।

◆সঠিক তথ্য:  রেটিনা বা অপটিক নার্ভ সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের পর চোখ দান করা যায়।

● চোখ মৃত্যুর পরে যে কোনও সময় দান করা যায়।


◆সঠিক তথ্য: মৃত্যুর ৬ ঘন্টার মধ্যে কোনও দাতার কাছ থেকে চোখ সংগ্রহ করা দরকার। দাতার দেহকে শীতল পরিবেশে রাখা উচিত।   চোখ বন্ধ করা, আর্দ্র সুতির কাপড় চোখের উপরে রাখা এবং মাথার নীচে দুটি বালিশ রাখতে হবে। কারণ, স্থানীয় চক্ষু সংগ্রহ কেন্দ্র (হাসপাতাল) বা চক্ষু ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সময় প্রয়োজন। আর সেই সময় যাতে চোখ ঠিক থাকে তার জন্যই এই পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।

●চোখ দান করে বিক্রি করা হয়।  

◆সঠিক তথ্য: যে কোনও মানব অঙ্গ বিক্রি ও ক্রয় করা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ; এটি একটি মহৎ কাজ এবং অনুমোদিত সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

শেষ করব বাংলাদেশের মুক্তমনা আরজ আলী মাতুব্বর দেহদান সম্পর্কে কি লিখেছেন আসুন জেনে নিই -


আরজ আলী মাতুব্বর (১৯০০–১৯৮৫)

আমাদের মত শিক্ষিত বলে কথিত সুশীলদের গালে সজোরে চড় বসিয়ে দিয়েছেন আরজ আলী মাতুব্বর। শুধু জীবিত অবস্থায় নিজেকে আর অন্যদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেননি, তিনি তার মৃত্যুর  সময়েও এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যে সাহস এর আগে কোন শিক্ষিত সুশীলেরা করে দেখাতে পারেনি। পাঠক মনে রাখবেন বাংলাদেশ এর প্রেক্ষাপট ও তৎকালীন সময়ে মৌলবাদীদের অত্যাচার ।

তিনি তার মৃতদেহ কবরে দাফন না করে মানব কল্যাণে দান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে লেখা  ‘কেন আমার মৃতদেহ মেডিকেলে দান করেছি’ শীর্ষক  প্রবন্ধে তিনি বলেন –


‘…আমি আমার মৃতদেহটিকে বিশ্বাসীদের অবহেলার বস্তু ও কবরে গলিত পদার্থে পরিণত না করে, তা মানব কল্যাণে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমার মরদেহটির সাহায্যে মেডিক্যাল কলেজের শল্যবিদ্যা শিক্ষার্থীগন শল্যবিদ্যা আয়ত্ত করবে, আবার তাদের সাহায্যে রুগ্ন মানুষ রোগমুক্ত হয়ে শান্তিলাভ করবে। আর এসব প্রত্যক্ষ অনুভূতিই আমাকে দিয়েছে মেডিকেলে শবদেহ দানের মাধ্যমে মানব-কল্যাণের আনন্দলাভের প্রেরণা।’


মাতুব্বরের মৃতদেহ দানপত্রটি হুবহ তুলে দিলাম –  যা এখনো আমাদের মতো মানবতাবাদীদের জন্য অফুরন্ত প্রেরণার উৎস –


অধ্যাপক আহমদ শরীফ ( 1921 - 1999)

মাতুব্বরের মতো বাংলার বিবেক, অধ্যাপক আহমদ শরীফও তার মৃতদেহকে  মেডিকেল মানব কল্যাণে দান করে গেছেন। আরজ আলী মাতুব্বরের মৃতদেহ দানপত্রের মতো আহমদ শরীফের সম্পাদিত ( মৃত্যুর চার-পাঁচ বছর আগে)  তার ‘অছিয়তনামা’ আর ‘মরদেহ হস্তান্তরের দলিল’ দুটিও বাংলা আর বাঙালির মুক্তবুদ্ধির ইতিহাসে অনন্য কীর্তি।


অছিয়তনামায়  তিনি লিখেছিলেন –


“আমি সুস্থ শারীরিক এবং সুস্থ মানসিক অবস্থায় আমার দৃঢ় সঙ্কল্প বা অঙ্গীকার স্থির সিদ্ধান্ত-রূপে এখানে পরিব্যক্ত করছি।


আমার মৃত্যুর পরে আমার মৃতদেহ চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের  অ্যানাটমি এবং ফিজিওলজি সংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের জন্য ঢাকার ধানমন্ডিস্থ বেসরকারী মেডিকেল কলেজে অর্পণ করতে চাই। … চক্ষুদান এবং রক্তদান তো চালুই হয়েছে। চোখ শ্রেষ্ঠ প্রত্যঙ্গ, আর রক্ত হচ্ছে প্রাণ-প্রতীক। কাজেই গোটা অঙ্গ কবরের কীটের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মানুষের কাজে লাগাই তো বাঞ্ছনীয়।”


জ্যোতি বসু (১৯১৪ – ২০১০)


২০১০ সালের ১০ই জানুয়ারি কলকাতার সল্ট লেকের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর কিছু সময় পরেই তাঁর চোখের কর্নিয়া অপসারণ করেন চিকিৎসকরা, তারপর তার দেহ ছাত্র ছাত্রীদের গবেষণার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।   জ্যোতি বসু জীবিত অবস্থাতেই বলে গিয়েছিলেন  এভাবে –


“জানিনা আমার অশক্ত শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কারো কাজে আসবে কিনা! কিন্তু আমার ঐকান্তিক ইচ্ছা যে আমার মরদেহ যেন অন্তত গবেষণার কাজে লাগানো হয়।একজন কমিউনিস্ট হিসেবে জানতাম জীবিতকালে মানুষের সেবা করতে পারব। মৃত্যুর পরেও যে মানবতার কাজে লাগা যাবে, এটা জেনে প্রফুল্ল বোধ করছি।”


প্রথমেই জানাই আপনি যদি মরণোত্তর দেহদান ও প্রত্যঙ্গদানের জন্য অঙ্গীকার করতে চান তবে যোগাযোগ করতে পারেন।


1- গণদর্পণ

৪, ডি এল খান রোড, কর্পোরেশন ব্লিডিং, কলকাতা – ৭০০ ০২৫

দূরভাষ – (০৩৩) ২৪৫৪ ০৮৯১ / ২৪১৯ ১১৬৫

http://www.ganadarpanindia.in/index.php

ওয়েবসাইট এ গিয়ে প্লেজ ফর্ম পাবেন ডাউনলোড করে নিন পছন্দ মত ভাষায়। ফিলাপ করে ওদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলে ওরাই আপনাকে একটি কার্ড পাঠিয়ে দেবে। গণদর্পণ কোন চক্ষু বা মৃতদেহ সংগ্রহ করে না। একমাত্র প্রত্যঙ্গদানের ক্ষেত্রে সহয়তা করে।

চাইলে অনলাইনের মাধ্যমেও এই কাজটা করতে পারেন। https://www.notto.gov.in

2- বাংলাদেশে যারা মরণোত্তর দেহদানে আগ্রহীঃ

জনবিজ্ঞান ফাউন্ডেশন

১০৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

বাংলামটর, ঢাকা

ফোন: ০১৫৫২৩৫৮০১৮

ইমেইল:

janabigganfoundation@gmail.com

ayubhoss@yahoo.com

3- Department of Anatomy, N.R.S. Medical College, 138, A.J.C. Bose Road, Kolkata - 700 014 Phone No. (033) 2265-3214 (EXTN.- 383)।

কলকাতার এন.আর.এস মেডিক্যাল কলেজ-এর Department of Anatomy থেকেও এই Pledge Formটি (একই ফর্মের দুটি কপি) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারেন।


4- চক্ষু দান এর জন্য

RIO Calcutta Medical College & Hospital Eye Bank.

9433085756 / 9007064831 / 033-22123767 / 033-22413853


5- বর্ধমান

Durgapur Blind Relief Society

C/o: SDO Office

City centre, Pin – 713 216

(0343) 2572698 / 9732066165


6- জলপাইগুড়ি

Alipurduar Lions Eye Hospital

Chowpathi. P.O – Alipurduar Dist- Jalpaiguri Pin – 736 121

(03224) 255938


7- হুগলি

Doyen Dishani

37, Hanseswari Road, Banshberia, Hooghly, Pin – (033) 26344555 / 26527555 / 9433084563 / 9433052503


8- দার্জিলিং

Siliguri Lions Eye Bank

Hillcart Road, P.O – Shiliguri, Dist – Darjeeling

2511004 / 2519793


কলকাতা থেকে দূরে যাঁরা থাকেন তাঁদের অনুরোধ করব মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে আপনাদের নিকটবর্তী সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।


সূত্র-

1-সংশয় ডট কম/ মৃত্যুই শেষ কথা নয় ।

2- ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির ফেসবুক পেজ ।

3- 13/05/2021 এর আনন্দবাজার পত্রিকা ।

4- মুক্তমনা ব্লগ।

কলকাতার জলাভূমি এবং এক পরিবেশবিদ। -সৌরদীপ চ্যাটার্জী
Nov. 18, 2024 | পরিবেশ | views: 9781 | likes:56 | share: 253 | comments:0

আপাতত টিভি আর খবরের কাগজ খুললেই দেখা যাচ্ছে, বন্যায় ভেসে যাচ্ছে দক্ষিণবঙ্গ। দামোদর, অজয়, দ্বারকেশ্বর, রূপনারায়ণ—রাঢ়বঙ্গের আপাত নিরীহ নদীগুলি রীতিমত ফুঁসছে! কলকাতায় কিছুদিন আগে অবধি বিভিন্ন জায়গায় জল জমে ছিল, সেই জল থেকে তড়িদাহত হয়ে দু’টি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটল। সবাই দেখছেন, হইহই করছেন, ফেসবুকে ‘দুয়ারে দীঘা’, ‘লন্ডন বানাতে গিয়ে ভেনিস’ ইত্যাদি ক্যাপশন জুড়ে দিচ্ছেন। কিছুদিন আগে আনন্দবাজারের ভেতরের পাতায় একটা ছোট্ট খবর বেরিয়েছিল। “বেআইনি দখলদারির চোটে আন্তর্জাতিক মর্যাদা হারানোর আশঙ্কা পূর্ব কলকাতা জলাভূমির”। কেউ দেখেছিলেন এবং সেই নিয়ে হইচই করেছিলেন বলে মনে পড়ে না।

এইভাবেই সামনে আসে ফলাফল, পেছনে থেকে যায় কারণগুলো।

জলাভূমিতে ভৌতিক রহস্য বা আলেয়ার গল্প আমরা ছোটবেলায় অনেক শুনেছি! কিন্তু গোটা জলাভূমিটাই যদি হয়ে ওঠে এক রহস্য? এরকমই এক রহস্যময় জলাভূমি হল ‘পূর্ব কলকাতা জলাভূমি’। যারা নলবন বা নুনের ভেড়িতে শীতকালে সামান্য উষ্ণতার খোঁজে পিকনিক করতে যান, তারা হয়ত জানেনই না, জায়গাটা একটি আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত ‘সাইট’; শুধু তাই নয়—বাংলা বা ভারতে নয়, সারা পৃথিবীরই একটি বিরল বিস্ময়! খুব সামান্য কয়েকজন হয়ত নামটা জানেন—‘রামসার সাইট!’ জলাভূমি সংরক্ষণ নিয়ে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ আন্তর্জাতিক চুক্তি। ইরানের একেবারে উত্তরে, কাস্পিয়ান সাগরের তীরে পাহাড়ে ঘেরা রুক্ষ ছোট্ট শহর রামসার, হাজার তিরিশ মত লোকের বসবাস। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে এখানেই বসেছিল জলাভূমি নিয়ে এক আন্তর্জাতিক বৈঠক। তখনও ইরান শাহের অধীনে। ইরান সরকার বৈঠকের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, প্রাথমিকভাবে ঠিক ছিল বৈঠক হবে কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অন্য এক শহরে—নাম বাবোলসার। কিন্তু ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে সিদ্ধান্ত বদলে বৈঠক সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ১৭৫ কিলোমিটার পশ্চিমে, রামসারে। মাত্র ১৮ টি দেশ প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল, আশ্চর্যজনকভাবে, তাতে ছিল ভারতও। তখন রামসারে এয়ারপোর্টও ছিল না। তেহরানে সবাই জমায়েত হলেন, তারপর গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হল প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দূরে। সম্মেলন শুরু করলেন খোদ ইরানের রাজপুত্র, আবদুল রেজা পহলভী। ৩ ফেব্রুয়ারি সেই সম্মেলনে একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার স্বাক্ষরিত হল—যে শহরের নামও কেউ জানত না, সেই শহরের নামে তার নাম হয়ে গেল ‘রামসার কনভেনশন অফ ওয়েটল্যান্ডস’। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ১৭১, সদর দফতর সুইজারল্যান্ডে।

বর্তমান ভারতে রামসার সাইটের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। তালিকায় আছে চিলিকা হ্রদ, মণিপুরের লোকটাক হ্রদ, কোল্লেরু হ্রদ, লোনার ক্রেটার, ভিতরকণিকা, কাশ্মীরের উলার হ্রদ। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আছে দু’টি। দ্বিতীয়টি আয়তনে ভারতের বৃহত্তম রামসার সাইট—সুন্দরবন। সুন্দরবন বহুল আলোচিত, চর্চিত এবং দর্শিতও। সারা বছর দেদার লোক বেড়াতে যান, পাঠ্যবইতে বাচ্চারাও পড়ে সুন্দরবনের গুরুত্ব। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রথম রামসার সাইটটি আমাদের চোখের সামনেই যেন অদৃশ্য হয়ে রয়েছে।

অদৃশ্যই বটে। কারণ আজ থেকে মাত্র তিরিশ বছর আগেও পুরোটাই ছিল রহস্যে ঘেরা। কীরকম রহস্য? প্রকৃতির এক বিচিত্র রহস্য! ভৌগলিকভাবে কলকাতা ভারতের অন্যতম নিচু শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাপলে চার-পাঁচ মিটারও হবে কিনা সন্দেহ! কলকাতার পশ্চিমে গঙ্গা, অথচ শহরের ঢাল পুবে। প্রতিদিন শহরে প্রায় সাতশো মিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় শহরে এই পরিমাণ বর্জ্যকে সাফাই করার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে নিকাশি প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়। কলকাতায় এমন একটিও ‘প্ল্যান্ট’ নেই। ছিলও না কোনোকালে। শহরও অত্যন্ত নিচু অববাহিকায়। তারপরেও, নোংরা জলে সেরকম বিশাল মাপের দূষণের কোনও খবর আসে না। তাহলে ওই অতখানি নোংরা জল যায় কোথায়?

ওপরের পুরো প্রশ্নটা আসলে বর্তমানকালের নয়, হবে অতীতের হিসেবে। সময়টা আশির দশক। প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল একজন সরকারি অফিসারের মাথায়। তিনি ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। পেশায় রাজ্য সরকারের ইঞ্জিনিয়ার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র—ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পাশাপাশি রীতিমত ইকোলজি বা বাস্তুবিদ্যায় পিএইচডি। রাজ্যে তখন সদ্য এসেছে বামফ্রন্ট সরকার। তাদেরই নির্দেশে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেমে পড়েছিলেন ধ্রুবজ্যোতিবাবু। চারিদিকে অনুসন্ধান চালালেন। নিকাশি প্ল্যান্টের কার্যপদ্ধতি বুঝতে মুম্বইয়ের ‘দাদার সিউয়েজ প্ল্যান্ট’ ঘুরে দেখে এলেন। কিন্তু কোথাও কিছুই জানা গেল না। কলকাতার বর্জ্য জলের নিকাশি কোথায়, কলকাতার কেউ জানে না। সেই জল কোথায় যায়—তাও কেউ জানে না। অন্যান্য শহরে যে জলের নিকাশিতে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, কলকাতায় যেন সেই জল ম্যাজিকের মত ‘ভ্যানিশ’ হয়ে যায়। শেষে একদিন তিনি নেহাতই ঘটনাচক্রে নিকাশি নালা আর খাল ধরে এগনো শুরু করলেন। দেখতে চান, নালাগুলো যায় কোথায়! এই উত্তর খুঁজতে গিয়েই ধ্রুবজ্যোতিবাবু হাজির হলেন কলকাতার পুবপ্রান্তের এই জলাভূমিতে। আপাতভাবে দেখলে মনে হয় জলাজমি—আমাদের ভাষায়, ‘নুনের ভেড়ি’—কোনো কাজে আসে না। তখন ওইসব এলাকা একেবারেই অনুন্নত, সামান্য রাস্তাঘাটও নেই। কিন্তু সেখানেই ধ্রুবজ্যোতিবাবু পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো শুরু করলেন। ফলাফল দেখে রীতিমত ‘চক্ষু চড়কগাছ’ অবস্থা। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ধ্রুবজ্যোতিবাবু জলের মতই সহজ করে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। “বর্জ্যজল আসলে কিছুই না, ৯৫% জল এবং ৫% জীবাণু। এই বিশাল জলাভূমিতে ওই বর্জ্যজলের জীবাণু জলজ বাস্তুতন্ত্রে শৈবাল ও মাছের খাদ্যে পরিণত হয়। ফলে স্রেফ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রেই সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে ও সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় পুরো জল পরিশুদ্ধ অবস্থায় চলে আসে, বিপুল মাছের ভাণ্ডার তৈরি করে—পুরোটাই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে—বিন্দুমাত্রও শোধন করাতে হয় না!”

প্রায় একার চেষ্টায় ধ্রুবজ্যোতিবাবু কলম্বাসের মত নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন শহরের পুবপ্রান্তের এই বিশাল জলাভূমিকে। যদিও ব্যাপারটা বিশ্বাস করাতে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল তাঁকে। ততদিনে সেই অগভীর জলাভূমির বেশ খানিকটা ভরাট করে সল্টলেক তৈরি হয়ে গিয়েছে। তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। তবে জলাভূমির গুরুত্বটা তিনিও বুঝতে পারেননি। তবু গঙ্গা থেকে পলি তুলে সেই লবণ হ্রদের প্রায় অর্ধেকটা ভরাট হয়েছিল, বাকিটা ডাক্তার রায় ছেড়ে রেখে দেন। ডাচ সংস্থা নেডেকো ও একদল যুগোস্লাভ ইঞ্জিনিয়ার দুর্দান্ত পরিকল্পনা করে নগর ‘ডিজাইন’ করেছিলেন। ১৯৭২ সালে জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন বসেছিল সল্টলেকে, সভাপতি ছিলেন ভাবী রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মা। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর থাকার জন্য তৈরি হয়েছিল ছোট্ট একটি বাংলো, নাম দেওয়া হয় ‘ইন্দিরা ভবন’। কিন্তু সেই ইন্দিরা ভবনের পরবর্তী বাসিন্দা—মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু—ক্ষমতায় আসতেই গোলমাল শুরু হয়। ডাঃ রায় ইউরোপের ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে এলাকা পরীক্ষা করিয়েছিলেন, কিন্তু বিলেত-ফেরত জ্যোতিবাবুর অত ধৈর্য ছিল না। ফলে সল্টলেকের আকার বাড়তে শুরু করল, শুরু হয় অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ। তখন জোর যার মুলুক তার। প্রোমোটারি শক্তি পাখনা মেলছে। ১৯৯০ সাল নাগাদ জ্যোতিবাবুর সরকার ঘোষণা করেন—ওই জলাভূমি বুজিয়ে একটা বিশাল বড় বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। রাজ্য সরকারের কর্মী ধ্রুবজ্যোতিবাবু চাইলেও তার বিরোধিতা করতে পারবেন না। অতএব তাঁর পরামর্শে হাইকোর্টে মামলা করল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'PUBLIC' (People United for Better Living in Calcutta)। ১৯৯২ সালে দেশের অন্যতম প্রথম পরিবেশবান্ধব রায়টি দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট—বিচারপতিরা ঘোষণা করলেন, ওই জলাভূমি বোজানো চলবে না, তাকে সংরক্ষণ করতে হবে।

ততদিনে জলাভূমি সংরক্ষণেই মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছেন ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। সরকারকে বোঝানোর বহু চেষ্টা করেছিলেন। সটান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়ে দরবার শুরু করেন তিনি। একদিন মুখ্যমন্ত্রীকেই তিনি নিয়ে যান সেখানে। তারপর জলের গুরুত্ব ও প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা বোঝাতে মুখ্যমন্ত্রীর সামনেই সেই তথাকথিত ভেড়ি বা নোংরা জলাভূমি থেকে এক গ্লাস জল তুলে ঢকঢক করে খেয়ে নেন। হাঁ হাঁ করে ওঠেন মুখ্যমন্ত্রী। আশেপাশে যাওয়ার মত কোনও পায়খানাও নেই। পেটখারাপ অনিবার্য। কিন্তু কিছুই হল না। ধ্রুবজ্যোতিবাবু দেখিয়ে দেন, ওই জল খেলেও কিছুই হবে না। ওই জল প্রাকৃতিকভাবে পরিশুদ্ধ।

সম্ভবত—ওই জলাভূমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক জলশোধক! 

লেখালেখি করতে ভালবাসতেন ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। শুরু করেন পূর্ব কলকাতার জলাভূমি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে লেখালেখি। তাঁরই প্রায় একক চেষ্টায় খবর পৌঁছয় সুইজারল্যান্ডে, আন্তর্জাতিক জলাভূমি সংরক্ষণ সংস্থার দফতরে। আসেন বিদেশী বিশেষজ্ঞরা। অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সকলেই। কারণ এরকম প্রাকৃতিক শোধন ভারত কেন, গোটা দুনিয়াতেও দ্বিতীয়টি নেই। নিজেদের জ্ঞাতে বা অজান্তেই ইংরেজরা এমন একটি জায়গাকে নিজেদের উপনিবেশের রাজধানী বানাতে বেছে নিয়েছিল, যার একদিকে গঙ্গার প্রবাহ, অন্যদিকে প্রাকৃতিক জলাভূমি। কলকাতা ময়দান যদি কলকাতার ফুসফুস হয়, তাহলে এই জলাভূমিই হবে তার কিডনি। অবশেষে ২০০২ সালে এল সেই সুখবর। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ‘রামসার সাইট’ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হল এই পূর্ব কলকাতা জলাভূমি।

স্বীকৃতি এলেও ধ্বংসলীলা থামেনি, চলেছে বছরের পর বছর ধরে। প্রায় তিরিশ হাজার মানুষের জীবিকা সরাসরিভাবে জড়িত এই জলাভূমির সঙ্গে। আজও আমরা জানিই না, রোজ গরম গরম ভাতের সঙ্গে পাতে যে মাছের ঝোল বা ঝাল খাই, তার বেশিরভাগটাই আসে আসলে এই ভেড়ি থেকে। পাশাপাশি, বিপুল পরিমাণ শাকসবজির জোগান দেয় এই এলাকা। স্রেফ এই কারণেই ভারতের সমস্ত মহানগরের মধ্যে বাজার খরচের ব্যাপারে সবচেয়ে সস্তা আমাদের কলকাতা। পাশাপাশি, বিপুল পরিমাণ অক্সিজেনের জোগানও দেয় এই জলাভূমি। কার্যত একটি পয়সাও খরচ না করে দূষিত জল নিয়ে সে ফেরত দেয় টাটকা জল, মাছ, শাকসবজি, অক্সিজেন। 

এবং এর সবচেয়ে রহস্যময় ভূমিকা হল বন্যা নিয়ন্ত্রণ। যে বিপুল পরিমাণ জলে প্রতিদিন ভেসে যেতে পারত কলকাতা, তার বেশিরভাগটাই টেনে নেয় এই জলাভূমি, তারপর অবশিষ্ট চলে যায় বিদ্যাধরী নদীতে। তাই অন্তত বছর দশেক আগে অবধি মুম্বই বা চেন্নাই নিয়মিত বন্যায় ভেসে গেলেও দিব্যি টিকে যেত কলকাতা। 

আজ ভেঙে পড়েছে পুরো ব্যবস্থাটাই। চলছে যথেচ্ছ প্রোমোটিং, জলাভূমি ভরাট, নগরায়ণ। চলছে দূষণ। ফলে নজিরবিহীন সংকটের মুখে পূর্ব কলকাতার এই জলাভূমি। প্রকৃতি সামান্য রুষ্ট হলেই আজ ভেসে যাচ্ছে কলকাতা। জমা জলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, জলবাহিত ও মশাবাহিত রোগ বাড়ছে। অজানা জ্বরে হাসপাতাল উপচে পড়ছে। ড্রেনগুলো অবরুদ্ধ। জলে তড়িদাহত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। রোজকার সান্ধ্য আড্ডায় উঠে আসে অনেক ভারি ভারি প্রসঙ্গ—লকগেট কখন খুলবে, কর্পোরেশন পাম্প চালাচ্ছে না কেন ইত্যাদি। অথচ এইগুলোর কোনোটাই যে স্থায়ী সমাধান নয়, তা আমজনতা বুঝতে চান না, রাজনীতিবিদরা বুঝতে দেন না। কারণ বুঝতে দিলে তাঁদের বিপদ। রাজনীতির নেতাদের ব্যবসাটাই দাঁড়িয়ে আছে এই জলাভূমি ভরাটের ওপর। পূর্বতন বাম জমানায় যা ছিল, বর্তমান ঘাসফুল জমানায় তা তেড়েফুঁড়ে বেড়েছে। সরকারের হেলদোল নেই। সম্ভবত সরকার যারা চালান, তাঁদের এতটা গভীরে গিয়ে ভাবার মতও বিদ্যে নেই। বা বলা ভাল, ভাবার দরকারও নেই। এই পাম্প করে জল বের করা বা রাস্তা খুঁড়ে বছরের পর বছর পাইপ বসিয়ে চলা বা লকগেটের ওপর নির্ভর করা—এগুলি সবই আসলে ‘ডায়ালিসিস’ পদ্ধতি। যে পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে রক্ত পরিশোধন করে কিডনির কাজ চালানো হয়। সকলের অলক্ষ্যে ক্রমশ পাঁক জমে, দূষিত ও বিষাক্ত রাসায়নিক জমে ও ভরাট হয়ে বিকল হয়ে পড়ছে কলকাতার আসল সেই ‘কিডনি’—এই জলাভূমি। 

জলাভূমি নিয়ে আন্দোলন আমৃত্যু চালিয়ে গিয়েছেন ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। একাধিক বই লিখেছেন, তার মধ্যে ‘ইকোলজি অ্যান্ড ট্র্যাডিশনাল ওয়েটল্যান্ড প্র্যাকটিস’ বইটি কার্যত এই বিষয়ের ‘ইউজার ম্যানুয়াল’ হতে পারে। বইটি সম্ভবত আজ আর পাওয়া যায় না। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে জলাভূমি বা ‘ওয়েটল্যান্ড’-এর সংজ্ঞা, ব্যবহার, বিস্তার, প্রায়োগিক দিক ইত্যাদি সবই ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন ভারতের এক প্রখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী। লিখেছিলেন—“...অমর্ত্য সেনের ‘ওয়েলফেয়ার ইকনমিক্স’-এর মতই ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের এই আন্দোলনের নাম দেওয়া যেতে পারে ‘ওয়েলফেয়ার ইকোলজি’...”। লেখক—ভারতীয় সবুজ বিপ্লবের জনক প্রোফেসর এম এস স্বামীনাথন। 

দূর্ভাগ্য যে, তাঁর কথা অমান্য করার ফল কী হতে পারে, তা বহু আন্তর্জাতিক সম্মানে সম্মানিত ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ আর দেখে যেতে পারলেন না। ২০১৮ সালেই তিনি বিস্মৃতলোকে গমন করেন।

মন ও মনোবিজ্ঞান : ফ্রয়েডিয় অবৈজ্ঞানিক উদ্ভট তত্ত্ব -সুদীপ নাথ
Nov. 20, 2024 | যৌনতা | views: 9722 | likes:1 | share: 26 | comments:0

অনেকেই বলেন, আমাদের মন নাকি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। উনবিংশ শতাব্দি অব্দি অনেকেই মনে করতেন, মন বলতে যা কিছু বোঝায়, তার সব কিছুই জন্মসূত্রে পাওয়া বিষয়। তখন তারা ধারণা করতেন, মনের কোন বিচার বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। তখনকার ধারণাগুলো সবই ছিল অনুমান নির্ভর। যুগে যুগে বহু মনিষী, মনের অস্তিত্ব ও তার কার্যকলাপ নিয়ে অক্লান্ত গবেষণা করেছেন। কিন্তু শারীর বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে, মানব মনের হদিশ করতে তারা বার বার ব্যর্থ হয়েছেন। মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপের সাথে মানব মনের সম্পর্ক খুঁজে পেতে হয়রান হয়েছেন। বিশেষত প্রাণীর ঘিলু তথা মস্তিষ্কের জটিল ক্রিয়াকলাপ, তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের করায়ত্ত না থাকার ফলে, শরীর ও মস্তিষ্ক ভিত্তিক মনোবিদ্যা তখনো গড়ে উঠতে পারেনি। তখনও মনোবিদ্যা আলাদা কোন বিষয় হিসেবে গণ্য হত না। দর্শন শাস্ত্রেরই একটা উপশাখা হিসেবে গণ্য হত। সেই কারণে মনোবিদ্যার বিশেষ কোন গুরুত্ব ছিলনা। দর্শন শাস্ত্রের গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ থাকার কারণে, মানুষের মন নিয়ে সকলেই, যার যার নিজের মত করে, যা খুশি বলার রাস্তা খোলা ছিলো। 


তখন পর্যন্ত সকলেই, নিজের মন দিয়েই অন্যের মন বোঝার চেষ্টা করতেন । তখন দর্শন শাস্ত্রের উদ্দেশ্য ছিল, সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু বোঝা ও ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা। কবি সাহিত্যিকেরা, জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই মনের দ্বন্দ্ব খুঁজে বেড়াতেন। তখন জার্মান দেশই ছিল মনোবিদ্যা চর্চার প্রাণকেন্দ্র।


এদিকে, ১৯০৩ খৃষ্টাব্দে সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Frayed), The Interpretation of Dreams এবং Psychopathology of Everyday Life নামে দুটি বই লিখে পরিচিত হন। এই বই দুটি থেকে জানা যায় যে তিনি মানসিক রোগগ্রস্ত মনের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে স্বাভাবিক মনের ঠিকানা খুঁজতে প্রয়াসী হয়েছেন। ১৯০৫ সালে ফ্রয়েড যৌনমানস সম্পর্কে এক বইয়ে যৌনতার ক্রমবিবর্তন সম্পর্কিত এক তত্ত্ব প্রকাশ করেন। এই তত্ত্বের মূল কথাটি ছিল সর্বরতিবাদ। এই তত্ত্ব অনুসারে শৈশবের সবকিছু ইচ্ছা এবং আচরণই যৌনতা ভিত্তিক। ফ্রয়েডের এই তত্ত্ব লিবিডো তত্ত্ব নামে পরিচিত। তিনি আরও একটা তত্ত্ব খাড়া করে তার নাম দিয়েছিলেন ঈডিপাস কমপ্লেক্স। এই তত্ত্ব অনুসারে মাতার প্রতি পুত্রের মনে কামেচ্ছা জাগে এবং এই কামেচ্ছা নিবারনে পিতাকে সে তার পথের কাঁটা হিসেবে গন্য করে। একই ভাবে, কন্যারাও মাতাকে তাদের পথের অন্তরায় ভাবে। ফ্রয়েড ধারণা করেন এই সমস্ত তত্ত্ব দিয়েই সমাজ ও মানুষের জীবনের সমস্তকিছুই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তখন দার্শনিকদের বেশিরভাগই আমাদের মননক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে ভাববাদের আশ্রয় নিতেন, কল্পনার আশ্রয় নিতেন। ফ্রয়েড কিন্তু সেদিক থেকে একধাপ এগিয়ে নৃবিদ্যা, পৌরাণিক কাহিনী ইত্যাদির আশ্রয় নিয়েছেন। ফ্রয়েড প্রকৃতি-বিজ্ঞানের সাহায্য নেন নি। অথচ তখনই প্রকৃতি বিজ্ঞান অনেক কিছুই আবিষ্কার করে ফেলেছে। ফ্রয়েড মনে করতেন মানুষ সহজাত হিংস্র প্রবৃত্তি নিয়েই জন্মায় এবং তা সভ্যতার চাপে অবদমিত হয়ে থাকে। সময় সুযোগ মত তা মানুষকে হিংসাশ্রয়ী ধ্বংসাত্মক কাজ করতে উৎসাহিত করে। 


তিনি আনস্টাইনকে এক চিঠিতে, এই তত্ত্ব জানিয়ে এক বিশাল চিঠি লিখেছিলেন । তিনি ঐ চিঠিতে আনস্টাইনকে লিখেছিলেন, এই তত্ত্ব অনুসারে, যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী, যুদ্ধ হবেই। এই তত্ত্ব, সাম্রাজ্যবাদীদের খুব মনপছন্দ্‌ হয়ে উঠেছিল। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আর ব্যক্তি চেতনার প্রসারে, সাম্রাজ্যবাদ যখন বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনায় কোণঠাসা, ঠিক তখনই ফ্রয়েডের এই তত্ত্বকে তারা লুফে নিয়েছিল। যুদ্ধ উদ্দেশ্য মাত্রই বাজার দখল – এই ধারণা থেকে জনসাধারণকে মুক্ত করে, সাম্রাজ্যবাদীরা ফ্রয়েডীয় তত্ত্বকে উর্ধ্বে তুলে ধরে, তার জয়গান শুরু করে দিল। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এই তত্ত্বকে চাপিয়ে দেয়া হল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, ভারতে এই তত্ত্ব বাধ্যতামূলক করে টেক্সট্‌ বইয়ে অন্তর্ভূক্ত করে নিল। 


এখনো ভারতের সমস্ত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, এই তত্ত্ব বয়ে নিয়ে চলছে। কোনও বুদ্ধিজীবী টু শব্দটিও করছেন না, যা ভাবলে অবাক হতে হয়। অথচ ঐ সময়ের আগেই এই আজগুবি তত্ত্ব বিজ্ঞানের কষ্টি পাথরে যাচাই হয়ে বিজ্ঞানী মহল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এই তত্ত্বের উপর আর নির্ভর করে না। 


ক্ষুদ্র পরিসরে এখানে ফ্রয়েডিয় তত্ত্বের অসারত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করছি। বিস্তৃত আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। মোটকথা, ফ্রয়েড যৌনতাকে আশ্রয় করে তত্ত্ব বানিয়েছিলেন, অথচ যৌনতার উৎস খুঁজতে সামান্যতম চেষ্টাও করেননি। যৌনতার এনাটমি ও ফিজিওলজি নিয়ে চিন্তাও করেননি। যৌনতাকে মনন ক্রিয়ার পশ্চাৎপট (back ground) বিষয় হিসেবেই ধরে নিয়ে এগিয়ে গেছেন। মানসিক ক্রিয়ার অধঃস্তর (material substratum) অর্থাৎ মস্তিষ্ককেই বাদ দিয়ে, মনকে বুঝতে চেষ্টা করে গেছেন ফ্রয়েড সাহেব। ফ্রয়েডের কয়েকজন উত্তরসূরি, এই তত্ত্ব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলেও, বিশেষ কোন নূতন দিক নির্দেশ করতে পারেননি। 


এদিকে, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই জারের সহায়তায়, রাশিয়ার একদল বিজ্ঞানী, গবেষণাগারে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে, কালজয়ী শর্তাধীন পরাবর্ত তত্ত্ব (Theory of Conditioned Reflex) আবিষ্কার করেন। এই বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে ছিলেন নোবেন জয়ী ইভান পেত্রোভিচ পাভলভ। ল্যাবরেটরিতে, হাতে কলমে পরিক্ষার পর পরীক্ষা চালিয়ে যান। শর্তাধীন পরাবর্ত ভিত্তিক মনোবিদ্যার শুরু তখন থেকেই। তারপর পাভলভের নেতৃত্বে একের পর এক, অজানা তথ্য আবিষ্কার হতে থাকে। 


সংবেদন, প্রত্যক্ষণ, স্মৃতি, চিন্তা, স্বপ্ন, প্রক্ষোভ(emotion), ঐচ্ছিক নির্বাচন ইত্যাদি মনন ক্রিয়ার, বস্তুনির্ভর অধঃস্তরের (material substratum) সন্ধান এইসব গবেষণা থেকেই পাওয়া যায়। মস্তিষ্কের বিদ্যুৎ তরঙ্গ ও জৈব রসায়নের, যেমন হরমোন ইত্যাদির ক্রমবর্ধমান আবিষ্কার, পাভলভের এই তত্ত্বকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায়। অনুমান নির্ভর অন্তর্দর্শন ভিত্তিক মনস্তত্ত্বের দিন, তখনই ফুরিয়ে যায়। 


পাভলভই মনোবিদ্যাকে দর্শনের গণ্ডির বাইরে বের করে এনে, বিজ্ঞান নির্ভর মনোবিদ্যা চর্চার সোপানটি স্থাপন করেন। পাভলভের এই তত্ত্ব নির্ভর করে, প্রমাণিত হয়েছে মানুষের সবকিছু ধ্যানধারণার উদ্ভব ঘটে, মস্তিষ্কে বাইরের জগতের ঘটনা এবং বস্তুর ধর্ম ও পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিফলন থেকে। আর চেতনা হচ্ছে অতীব জটিল বস্তু-মস্তিস্কের বিশেষ প্রক্রিয়া। বাস্তব বহির্জগতের প্রতিফলনই, বাস্তব মস্তিষ্কে চেতনার প্রতিফলন ঘটায়। 


বহির্বাস্তবের সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্র এবং জ্ঞানেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে [পাঁচটি ইন্দ্রিয় হচ্ছে, শ্রবণেন্দ্রিয় (কান), দর্শনেন্দ্রিয় (চোখ), ঘ্রাণেন্দ্রিয় (নাক), স্বাদেন্দ্রিয় (জিভ) আর স্পর্শেন্দ্রিয় (চামড়া)], সম্পর্ক রক্ষার কাজই হচ্ছে স্বজ্ঞান প্রক্রিয়া বা চেতনা । চেতনা সংবেদনের মাধ্যমে মস্তিষ্কে বহির্বাস্তবের প্রতিফলন। আর এ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে কালজয়ী ‘প্রতিফলন তত্ত্ব’ যা The Theory of Reflection নামে সমাদৃত। 


এই প্রতিফলন তত্ত্বের (Theory of Reflection) উপর নির্ভর করেই বিজ্ঞানীরা কয়েকটি মৌলিক সূত্রও উপস্থাপিত করেন। মানুষ যখন প্রথম সামাজিক জীবে রূপান্তরিত হয়, তখন মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন ঘটেছিল। সমাজ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে, মানব মনে আরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। সামাজিক ক্রিয়া-কান্ডের সাথে মানুষের মনেরও প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটে। এখানেই ফ্রয়েডের মনগড়া তত্ত্ব দূরে হঠে গেছে। ফ্রয়েড ভেবেও দেখেননি যে, পরিবার প্রথার বিবর্তনের ধাপগুলো কিভাবে ঘটেছে। এ পর্যন্ত কয়েক ধরণের পরিবারের রূপ আমরা দেখেছি। আর তিনি বর্তমানের অতি প্রকট, এক-পতিপত্নী পারিবারিক রূপটির বাইরে কিছুই জানতেন না, বা দেখতে চেষ্টাও করেন নি। আর বর্তমানের এই এক পতিপত্নী পারিবারিক রূপটিও যে ইতিমধ্যেই ভাঙ্গতে শুরু করেছে, এটা সকলে দেখতেই পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে পিতার খোঁজ থাকবে কিনা কে বলতে পারে। আর যে পুত্রের পিতা, বর্তমান সমাজে বাইরে থাকে, পুত্রের জন্মের সময় থেকে, সেই পুত্র যখন কেবল মাত্র মা অথবা, মা ও প্রতিপালিকার সংস্পর্শে বড় হয়, কিংবা শুধুমাত্র প্রতিপালিকার সংস্পর্শে বা হোস্টেলে বড় হয়, তাদের ক্ষেত্রে লিবিডো তত্ত্ব কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? আর যে শিশুর মা জন্মক্ষণে মারা যান বা পিতা সন্তানকে গর্ভে রেখে মারা যান, সেই শিশুদের কি হবে? অথবা এইসব শিশুরা, যখন তাদের দাদু দিদিমারা প্রতিপালকের স্থানে থাকেন, তাদেরই বা লিবিডো তত্ত্বের কি ঘটবে? সমাজের পরিবর্তন ফ্রয়েড সাহেব দেখেন নি। তিনি মনে করতেন বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা আগেও ছিল, এবং তা সনাতন। 


বাস্তব জীবনের প্রত্যক্ষণ থেকে মানুষ ভাবনাচিন্তার বিষয় (content) যোগাড় করে। এসব প্রকৃতি আর সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ডের সঙ্গেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আর আমাদের ক্ষেত্রে, সমস্ত প্রত্যক্ষণের সহায়তায় নূতন নূতন সংকেতের উপর একটা বিমূর্ত রূপ অনুভূত হতে থাকে। এইভাবেই গড়ে উঠে ধারণা। আর তাকে সাধারণীকরণ করার মাধ্যমে তা হয়ে উঠে বিমূর্ত। মস্তিস্ক, বাইরের পরিবর্তনের সাথে সক্রিয় এবং পরিবর্তনশীল সম্পর্ক স্থাপন করে, প্রতিনিয়ত আমাদের অভিযোজনে সাহায্য করছে। তারই নাম স্বজ্ঞান ক্রিয়া। 


অতীতের কোন প্রত্যক্ষণ যখন আমাদের মস্তিষ্কে অনুভুতি জাগায়, তখন তাকে বলা হয় চিন্তা। তা যুক্ত হতে পারে চলমান প্রত্যক্ষণের সাথেও। অতীতের অনেকগুলো ধারণা থেকেও আমরা নতুন নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে পারি। এই পুরনো ধারণার উপর নির্ভর করে, নূতন ধারণা সৃষ্টি করাকে বলা হয় কল্পনা। 


মনের মধ্যে একবার ধারণা তৈরি হয়ে গেলে, খুশিমতো একটার সঙ্গে একটা জুড়ে দিয়ে কিম্ভূত কিমাকার অনেক ধারণা তৈরি করাও সম্ভব। জীন, পরী, দৈত্য, এমনকি ঈশ্বরও আমাদের মনে এভাবেই সৃষ্টি হয়, সম্পূর্ণ কল্পনার উপর দাঁড়িয়েই। উচ্চমার্গের মননক্রিয়া তথা ধারণা এবং চিন্তা (concept and thought) যেমন ভ্রান্তি দূর করতে পারে, ঠিক তেমনই আবার ভ্রান্তি তৈরিও করতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এসবের মূলে আছে বস্তু। 


প্রত্যক্ষণ, ধারণা, চিন্তা এবং চেতনা আমাদের কার্যকলাপ এবং বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ থেকেই জন্মায়। আবার অতীতের ধারণা, চিন্তা এবং চেতনা আমাদের কার্যকলাপ এবং জীবনক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে এবং সর্বোপরি জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহন করে। 


মনস্তত্ত্ব শুধুমাত্র জীববিদ্যার বিষয় নয়। তা সামজিক-ঐতিহাসিক বিদ্যার সাথেও সম্পর্কিত। মানবমন গুণগতভাবে পশুমন থেকে স্বতন্ত্র। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুধুমাত্র আমাদের মানসিকতারই বিবর্তন ঘটে না, মনন ক্রিয়ার নিয়মেরও পরিবর্তন ঘটে চলে এবং তা সর্বদা একটা চলমান প্রক্রিয়া। 


শর্তাধীন পরাবর্ত তথা Conditioned Reflex-এর দৌলতেই আমরা আমাদের চৈতন্যের উন্মেষ ঘটাতে পেরেছি। এই শর্তাধীন পরাবর্ত আবার শর্তহীন পরাবর্ত অর্থাৎ জন্মগত রিফ্লেক্সের উপর নির্ভর করেই গড়ে উঠে। নূতন নূতন শর্তাধীন পরাবর্ত যেমন গড়ে উঠে, আবার সেগুলো ভেঙ্গেও যেতে পারে। এই ভাঙ্গা গড়া সবসময় চলতে থাকে। 


তাই বলে, মানুষের আচরণের মূলে, নির্জ্ঞান বা ছোট বেলার অবদমিত কামনা বাসনার কোনও ভূমিকাই নেই। চেতনা অপরিস্ফুট থাকতে পারে, তার ব্যাপ্তি ও বিস্তার সম্বন্ধে সবকিছু জ্ঞান আমাদের না থাকতে পারে, কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রত্যক্ষনের সাহচর্যে, প্রয়োজনীয় চৈতন্যের সম্যক উন্মেষ ঘটানো সম্ভব। 

Click to Load More...

আমাদের কথা


এই দুর্নিবার সময়েও লেখনী চালিয়ে যাওয়ার মত ধীশক্তি ধরে রেখে মুক্তচিন্তকরা নিরন্তর লিখে চলেছেন। তাঁদের লেখাগুলি সংকলিত করে প্রকাশিত হয়ে চলেছে চেতনার অন্বেষণে পত্রিকা। যা দুই বাংলার পাঠকদের কাছে দ্রুত সমাদৃত হয়। এই পথ চলার একটি ধাপে এসে অন্বেষণ পাবলিশার্স পথ চলা শুরু করেছে মূলত মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্ক বইগুলিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে। আমাদের কথা বলতে লেখক, পাঠক সবাই মিলিয়েই আমরা।

ওয়েবসাইট প্রসঙ্গে


এটি মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ চর্চা এবং বইপত্রের প্ল্যাটফর্ম। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যুক্তিবাদীদের লেখার চর্চাকে অনুপ্ররণা যোগাবে। লগইন করে আপনিও লিখতে পারবেন, ওয়েবসাইটটি সমস্ত বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত।

যোগাযোগ


Email: yuktibadira@gmail.com

WhatsApp: +91-9433794-113


Website visit count:
91286