ভারতের পরমাণু চর্চা (নবম পর্ব) : সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও ভারতের পরমাণু গবেষণার আধুনিক অগ্রগতি (২০০৬–বর্তমান) এবং উপসংহার

Tushar Gorai


Nov. 1, 2026 | | views :2 | like:0 | share: 0 | comments :0

২০০৫ সালের জুলাই মাসে ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখা স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতের পরমাণু কর্মসূচি এক দীর্ঘ ও পরিবর্তনশীল পথ অতিক্রম করেছে। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা এবং ড. মেঘনাদ সাহার মতো দূরদর্শী বিজ্ঞানীদের হাত ধরে যে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে তা এক পরিণত ও বহুমুখী রূপ লাভ করেছে। একদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু বাণিজ্যের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে বৈদেশিক জ্বালানি ও প্রযুক্তির সমন্বয়, অন্যদিকে দেশের নিজস্ব থোরিয়াম ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে উন্নত চুল্লি নির্মাণ—এই দুই ধারার সংমিশ্রণে ভারতের বর্তমান পরমাণু গবেষণা এগিয়ে চলেছে।

৯.১ ভারত-মার্কিন চুক্তির পরবর্তী বাস্তবতা, এনএসজি ছাড়পত্র ও পারমাণবিক দায়বদ্ধতা আইন

২০০৫ সালের ১৮ জুলাই মনমোহন সিং ও জর্জ বুশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির পর ভারতের পরমাণু কেন্দ্রগুলোকে সামরিক ও অসামরিক—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার যে জটিল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা ২০০৮ সালে চূড়ান্ত রূপ পায়। ভারত তার অসামরিক পারমাণবিক চুল্লিগুলোকে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এর বিনিময়ে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৪৮টি দেশের গোষ্ঠী ‘নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ’ (NSG) ভারতকে এক ঐতিহাসিক বিশেষ ছাড়পত্র (Waiver) প্রদান করে। বিশ্বের একমাত্র এনপিটি (NPT)-বহির্ভূত পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি কেনার বৈধ অধিকার লাভ করে।

তবে তৎকালীন সমালোচকদের এবং ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের প্রাক্তন ডিরেক্টর ড. এ. এন. প্রসাদের আশঙ্কা অনেকটাই সত্য প্রমাণিত হয় যখন দেখা যায় যে, এই চুক্তির পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো বাণিজ্যিক পারমাণবিক চুল্লি ভারতে স্থাপিত হয়নি। এর প্রধান কারণ ছিল দু’টি: প্রথমত, মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলোর চুল্লির অত্যধিক মূল্য, যার ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। দ্বিতীয়ত, ২০১০ সালে ভারতীয় সংসদে গৃহীত ‘অসামরিক পারমাণবিক দায়বদ্ধতা আইন’ (Civil Liability for Nuclear Damage Act, 2010)। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে ভারত এই আইনে বিধান রাখে যে, কোনো পারমাণবিক চুল্লিতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে তার আর্থিক ক্ষতিপূরণের দায়ভার কেবল চুল্লি পরিচালনাকারী সংস্থার নয়, বরং চুল্লি সরবরাহকারী বিদেশি কোম্পানির ওপরেও বর্তাবে। মার্কিন সংস্থাগুলো (যেমন জেনারেল ইলেকট্রিক বা ওয়েস্টিংহাউস) এই দায়বদ্ধতার শর্ত মেনে নেয়নি। তবে এই চুক্তির প্রধান সুফল হিসেবে কাজাখস্তান, কানাডা, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো থেকে ভারতের পুরনো ও নতুন চুল্লিগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন ইউরেনিয়াম জ্বালানি আমদানির পথ প্রশস্ত হয়, যা ভারতের দেশীয় ইউরেনিয়ামের ঘাটতি মেটাতে সহায়তা করে।

৯.২ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও বর্তমান উৎপাদন চিত্র

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতে যেখানে দশটি পরমাণু চুল্লি সক্রিয় ছিল এবং কাইগাতে দুটি ও রাজস্থানের কোটা অঞ্চলে দুটিসহ মোট চারটি চুল্লি নির্মাণের পথে ছিল, সেখানে গত দুই দশকে চুল্লির সংখ্যা ও উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তৎকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী মহারাষ্ট্রের তারাপুরে, রাজস্থানে, কর্ণাটকের কাইগায় এবং তামিলনাড়ুর কুদানকুলামে আরও বারোটি নতুন চুল্লি বসানোর যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল, তার অধিকাংশই আজ বাস্তবায়িত হয়েছে বা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের হালনাগাদ চিত্রটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  •  সক্রিয় চুল্লি ও উৎপাদন ক্ষমতা: বর্তমানে (২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে) ভারতের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে (তারাপুর, রাওয়াতভাটা, কালপাক্কাম, নারোরা, কাকরাপার, কাইগা এবং কুদানকুলাম) মোট ২৪ থেকে ২৫টি পারমাণবিক চুল্লি বাণিজ্যিকভাবে সক্রিয় রয়েছে এবং দেশের মোট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮,০০০ মেগাওয়াট (৮ গিগাওয়াট) অতিক্রম করেছে।
  •  দেশীয় প্রযুক্তির ৭০০ মেগাওয়াট চুল্লি: ড. হোমি ভাবার প্রদর্শিত স্বনির্ভরতার পথে হেঁটে ভারতের নিজস্ব সংস্থা ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড’ (NPCIL) সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ৭০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার উন্নত ‘প্রেশারাইজড হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর’ (PHWR) বা ভারী জলের চুল্লি নির্মাণে সাফল্য অর্জন করেছে। গুজরাটের কাকরাপার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট (KAPS-3 & 4) এবং রাজস্থানের রাওয়াতভাটার ৭ নম্বর ইউনিট (RAPS-7) এই দেশীয় প্রযুক্তির উজ্জ্বল নিদর্শন।
  •  কুদানকুলাম ও রুশ সহযোগিতা: শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় তামিলনাড়ুর কুদানকুলামে রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বিশাল ‘ভিভিইআর’ (VVER - হালকা জলের চুল্লি) ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং আরও চারটি অনুরূপ চুল্লি (ইউনিট ৩, ৪, ৫ ও ৬) নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।

৯.৩ ভারতের ত্রিস্তরীয় পরমাণু কর্মসূচি এবং থোরিয়াম গবেষণার আধুনিক অগ্রগতি

ভারতের পরমাণু গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরে থাকা বিপুল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জন করা, যাতে দেশবাসীর জন্য সুলভে বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়। বিশ্বে মোট সঞ্চিত থোরিয়ামের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ু ও ওড়িশার উপকূলীয় মোনাজাইট বালিতে রয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক থোরিয়াম-২৩২ নিজে সরাসরি বিভাজনযোগ্য (Fissile) জ্বালানি নয়; একে চুল্লির ভেতরে নিউট্রন শোষণের মাধ্যমে কৃত্রিম ফিসাইল জ্বালানি ইউরেনিয়াম-২৩৩-এ রূপান্তরিত করে তবেই শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব। এই জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নের জন্যই ড. হোমি ভাবা ভারতের ‘ত্রিস্তরীয় পরমাণু কর্মসূচি’ (Three-Stage Nuclear Programme) প্রণয়ন করেছিলেন:

১. প্রথম স্তর (প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ও ভারী জলের চুল্লি): এই স্তরে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ভারী জলের চুল্লিতে (PHWR) বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় এবং উপজাত পদার্থ হিসেবে প্লুটোনিয়াম-২৩৯ তৈরি হয়। ভারত এই প্রথম স্তরে ইতিমধ্যেই পূর্ণাঙ্গ সাফল্য ও স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে।

২. দ্বিতীয় স্তর (ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর বা FBR): ১৯৪৮ সালের পরমাণু শক্তি আইনের গোপনীয়তার সুরক্ষায় ভারতীয় বিজ্ঞানীরা হাতে-কলমে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’ (Fast Breeder Reactor) বা দ্রুতগতির প্রজনন চুল্লি উদ্ভাবন করেছিলেন। এই চুল্লির বৈশিষ্ট্য হলো, এটি যতটা পারমাণবিক জ্বালানি খরচ করে, তার চেয়ে বেশি জ্বালানি উৎপাদন (Breed) করতে পারে। প্রথম স্তর থেকে প্রাপ্ত প্লুটোনিয়াম-২৩৯ জ্বালানির সাথে চারপাশে থোরিয়াম-২৩২-এর আবরণ (Blanket) ব্যবহার করে এই চুল্লিতে একদিকে বিদ্যুৎ এবং অন্যদিকে তৃতীয় স্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম-২৩৩ জ্বালানি তৈরি করা হয়। ১৯৮৫ সালে কালপাক্কামে একটি পরীক্ষামূলক ‘ফাস্ট ব্রিডার টেস্ট রিঅ্যাক্টর’ (FBTR) স্থাপনের পর, সম্প্রতি (২০২৪ সালে) কালপাক্কামেই সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বাণিজ্যিক ‘প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’ (PFBR)-এ জ্বালানি ভরার (Core Loading) কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা ভারতের পরমাণু ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক।

৩. তৃতীয় স্তর (থোরিয়াম-ভিত্তিক উন্নত চুল্লি): এই চূড়ান্ত স্তরে থোরিয়াম-২৩২ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৩-এর সমন্বয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্বালানি চক্র গড়ে তোলা হবে। এর প্রস্তুতির জন্য কালপাক্কামে ইউরেনিয়াম-২৩৩ চালিত বিশ্বের একমাত্র সচল চুল্লি ‘কামিনী’ (KAMINI) গবেষণার কাজ করছে এবং ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC) ৩০০ মেগাওয়াটের ‘অ্যাডভান্সড হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর’ (AHWR) এবং গলিত লবণের চুল্লি (Molten Salt Breeder Reactor)-এর নকশা তৈরি করেছে। যদিও বাণিজ্যিক স্তরে বিপুল লগ্নি ও জটিল প্রযুক্তির বাধা পেরিয়ে তৃতীয় স্তরের পূর্ণ বাস্তবায়নে আরও কয়েক দশক সময়ের প্রয়োজন, তবুও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এই লক্ষ্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

৯.৪ মৌলিক বিজ্ঞান, ফিউশন গবেষণা (ITER) ও সমাজকল্যাণে পরমাণু প্রযুক্তি

১৯৫৪ সালে ড. মেঘনাদ সাহার প্রস্তাবে গঠিত পরমাণু শক্তি দপ্তরের (DAE) অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মৌলিক গবেষণা এবং চুল্লি থেকে রেডিও আইসোটোপ বের করে এনে রোগের ঔষধ ও কৃষিতে ব্যবহারযোগ্য উপাদান প্রস্তুত করা। বর্তমান সময়ে ভারত সেই লক্ষ্যগুলো সার্থকভাবে পূরণ করে চলেছে:

  •  আন্তর্জাতিক ফিউশন গবেষণা ও মৌলিক বিজ্ঞান: প্রথম অধ্যায়ে আলোচিত পরমাণু সংযোজন বা ফিউশন (Fusion) প্রক্রিয়াকে ভবিষ্যতের নিরাপদ ও অফুরন্ত শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফ্রান্সে অবস্থিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক ফিউশন গবেষণা প্রকল্প ‘ইটার’ (ITER - International Thermonuclear Experimental Reactor)-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ভারত একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমমর্যাদার অংশীদার রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত রয়েছে এবং প্রকল্পের অত্যাধুনিক ক্রায়োস্ট্যাট (Cryostat) সহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভারত নিজে তৈরি করে সরবরাহ করেছে। এছাড়াও কলকাতার ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার (VECC) এবং ইন্দোরের রাজা রমান্না সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড টেকনোলজি (RRCAT/CAT) কণা ত্বরক, লেজার ও ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তিতে বিশ্বমানের গবেষণা পরিচালনা করছে।
  •  চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োগ: মুম্বাইয়ের ট্রম্বেতে ১৯৫৬ সালে নির্মিত ভারতের প্রথম গবেষণা চুল্লি ‘অপ্সরা’কে পরবর্তীতে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে আধুনিকীকরণ করে ২০১৮ সালে ‘অপ্সরা-আপগ্রেডেড’ (Apsara-U) হিসেবে পুনরায় চালু করা হয়েছে। এই চুল্লি এবং ‘ধ্রুব’ চুল্লি থেকে উৎপাদিত রেডিও আইসোটোপ আজ ভারতের লক্ষ লক্ষ ক্যান্সার রোগীর স্বল্পমূল্যে রেডিয়েশন থেরাপি ও রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় রশ্মির পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র (BARC) ডাল, তৈলবীজ ও ধানের অর্ধশতাধিক উচ্চফলনশীল ও খরা-সহনশীল বীজ উদ্ভাবন করেছে এবং খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য বিকিরণ প্রযুক্তি (Food Irradiation) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছে।
  •  জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা: কয়লা পুড়িয়ে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে পরিবেশে যে বিপুল কার্বন নিঃসরণ ঘটে, তার তুলনায় পরমাণু শক্তি একটি পরিচ্ছন্ন ও কার্বন-মুক্ত শক্তির উৎস। ভারত আগামী ২০৭০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’ (Net Zero) বা শূন্য কার্বন নিঃসরণের যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করেছে এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ১ লক্ষ মেগাওয়াট (১০০ গিগাওয়াট) পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, তা পূরণের জন্য বর্তমানে ছোট আকারের নিরাপদ চুল্লি বা ‘স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর’ (Bharat Small Reactors - BSR) তৈরির নতুন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

৯.৫ উপসংহার: সার্বভৌমত্ব, বিজ্ঞানমনস্কতা ও শান্তির অন্বেষণ

ভারতের পরমাণু চর্চার এই সুদীর্ঘ ও ঘটনাবহুল ইতিহাস কেবল কতগুলো পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ বা পোখরানের মরুভূমিতে ঘটানো বিস্ফোরণের কারিগরি খতিয়ান নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশ-উত্তর একটি উন্নয়নশীল জাতির বৈজ্ঞানিক আত্মমর্যাদা, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক একাধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক প্রামাণ্য দলিল। ১৯৪৪ সালে ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার হাত ধরে টাটা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৮ সালের পরমাণু শক্তি আইন এবং ১৯৫৪ সালে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ও ড. মেঘনাদ সাহার যৌথ প্রচেষ্টায় পরমাণু শক্তি দপ্তর (DAE) গঠনের মাধ্যমে ভারতে যে প্রাতিষ্ঠানিক বীজটি রোপিত হয়েছিল, তা শুরু থেকেই পরমাণু শক্তির ধ্বংসাত্মক রূপটিকে বর্জন করে মানবকল্যাণ ও অর্থনৈতিক বিকাশের শান্তিপূর্ণ পথকেই বেছে নিয়েছিল।

কিন্তু ঠান্ডা যুদ্ধের মেরুকরণ, তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর বৈষম্যমূলক চুক্তির (PTBT, NPT, CTBT) নাগপাশ এবং ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ভারতকে এক কঠিন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ১৯৫৩ সালের থোরিয়াম বিতর্ক থেকে শুরু করে ১৯৭৪-এর প্রথম পোখরান এবং ১৯৯৮-এর দ্বিতীয় পোখরান পরীক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র নিষেধাজ্ঞা এবং অসহযোগিতা সত্ত্বেও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, মৌলিক বিজ্ঞানচর্চা এবং দেশীয় প্রযুক্তির ভিত্তি যদি সুদৃঢ় হয়, তবে কোনো বৈদেশিক অবরোধই একটি দেশের অগ্রগতিকে রুখে দিতে পারে না। ‘পূর্ণিমা’ ও ‘ধ্রুব’ চুল্লি নির্মাণ, ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ভারতের সেই অদম্য বৈজ্ঞানিক স্বনির্ভরতারই ফসল।

একই সাথে এই ইতিহাস আমাদের এও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে বৈদেশিক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা—তা সে ১৯৬৩ সালের তারাপুর চুক্তিই হোক কিংবা ২০০৫ সালের ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইরান প্রশ্নে বৈদেশিক নীতির আপসই হোক—সবসময়ই দেশের স্বাধীন নীতি ও সুলভ জ্বালানি নিরাপত্তার সামনে নতুন সংকট তৈরি করেছে। হিরোশিমা ও নাগাসাকির সেই চরম মানবিক বিপর্যয়ের স্মৃতি এবং আধুনিক বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি আজও মানব সভ্যতাকে তাড়া করে ফিরছে। তাই ভারতের পরমাণু নীতির সার্থকতা নিহিত রয়েছে একদিকে বৈষম্যহীন সার্বিক বিশ্ব পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দাবিতে অবিচল থাকা এবং অন্যদিকে দেশের বিপুল থোরিয়াম সম্পদকে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ বিদ্যুৎ, উন্নত চিকিৎসা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে। পরমাণুর অন্তর্নিহিত অমিত শক্তি যখন পরাশক্তির কূটনৈতিক দাবার ঘুঁটি না হয়ে কেবলমাত্র মানবকল্যাণ ও সমাজের প্রগতির কাজে নিবেদিত হবে, তখনই ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানীদের এই দীর্ঘ তপস্যা তার প্রকৃত পূর্ণতা লাভ করবে।

আমাদের কথা


এই দুর্নিবার সময়েও লেখনী চালিয়ে যাওয়ার মত ধীশক্তি ধরে রেখে মুক্তচিন্তকরা নিরন্তর লিখে চলেছেন। তাঁদের লেখাগুলি সংকলিত করে প্রকাশিত হয়ে চলেছে চেতনার অন্বেষণে পত্রিকা। যা দুই বাংলার পাঠকদের কাছে দ্রুত সমাদৃত হয়। এই পথ চলার একটি ধাপে এসে অন্বেষণ পাবলিশার্স পথ চলা শুরু করেছে মূলত মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্ক বইগুলিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে। আমাদের কথা বলতে লেখক, পাঠক সবাই মিলিয়েই আমরা।

ওয়েবসাইট প্রসঙ্গে


এটি মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ চর্চা এবং বইপত্রের প্ল্যাটফর্ম। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যুক্তিবাদীদের লেখার চর্চাকে অনুপ্ররণা যোগাবে। লগইন করে আপনিও লিখতে পারবেন, ওয়েবসাইটটি সমস্ত বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত।

যোগাযোগ


Email: yuktibadira@gmail.com

WhatsApp: +91-9433794-113


Website visit count:
96049