ভারতের পরমাণু চর্চা (অষ্টম পর্ব) : ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি (২০০৫) এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | | views :2 | like:0 | share: 0 | comments :0
১৯৯৮ সালের দ্বিতীয় পোখরান বিস্ফোরণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির তাগিদে ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করে। ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে নিজেদের একাধিপত্য বজায় রাখা, এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে প্রতিহত করা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নয়াদিল্লিকে পাশে পাওয়ার কৌশলগত উদ্দেশ্য থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে পারমাণবিক সহযোগিতার নতুন পথ উন্মোচন করে। এরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৫ সালের জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি’র মাধ্যমে। তবে এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর কেবল ভারতের অভ্যন্তরেই নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের স্বাধীন বৈদেশিক নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়।
৮.১ ১৮ জুলাই ২০০৫-এর দ্বিপাক্ষিক চুক্তি: প্রতিশ্রুতি, ব্রিটেনের আপত্তি এবং সামরিক-অসামরিক বিভাজন
২০০৫ সালের ১৮ জুলাই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশের সাথে ঐতিহাসিক ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তিতে (যৌথ বিবৃতি বা ফ্রেমওয়ার্ক) স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, আমেরিকা ভারতকে একটি দায়িত্বশীল ‘পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র’ (অঘোষিত বা ডি-ফ্যাক্টো স্বীকৃতি) হিসেবে মেনে নেবে এবং ভারতের ওপর থেকে পারমাণবিক বাণিজ্যের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে সচেষ্ট হবে। চুক্তিতে স্থির হয় যে, কেবলমাত্র অসামরিক ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং গবেষণার জন্য আমেরিকা ভারতকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম), আধুনিক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা চুল্লি এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ প্রদান করবে।
কিন্তু মার্কিন এই আশ্বাসের বিনিময়ে ভারতকেও বেশ কিছু কঠিন ও ব্যয়বহুল প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছিল।
প্রথমত, চুক্তির পরই আন্তর্জাতিক মঞ্চে আইনি বিতর্ক মাথাচাড়া দেয়। ভারত যেহেতু পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করেনি, তাই আন্তর্জাতিক পরমাণু বিধির দোহাই দিয়ে ব্রিটেন প্রাথমিক পর্যায়ে উপরিউক্ত ভারত-আমেরিকা পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। ব্রিটেনের এই আপত্তি প্রচলিত আন্তর্জাতিক পরমাণু বিধিসম্মত হলেও, প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ভারতকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে চুক্তি অনুযায়ী ভারত তার প্রতিশ্রুতিগুলো পালন করলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের জ্বালানি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনোরূপ বাধা আসবে না। উল্লেখ্য, ১৮ জুলাই ২০০৫-এর এই চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা থেকে পারমাণবিক জ্বালানি নিতে গেলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল এবং জর্জ বুশ এই বিষয়ে সাহায্য করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন—যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ওই আন্তর্জাতিক সংস্থাটিতে মার্কিন আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ কতটা গভীর।
দ্বিতীয়ত, ভারতের পরমাণু শক্তি কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের আওতায় আনতে গেলে ভারতের সামরিক (অস্ত্র নির্মাণকারী) এবং অসামরিক (বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী) পরমাণু শক্তিকেন্দ্রগুলোর মধ্যে এক স্পষ্ট বিভাজন রেখা টানা বাধ্যতামূলক করা হয়। কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এই বিভাজন ছিল ভারতের পক্ষে এক অত্যন্ত দুঃসাধ্য কাজ। কারণ, শুরু থেকেই ভারতের পরমাণু কর্মসূচি ছিল সমন্বিত; সেখানে সামরিক এবং অসামরিক পরমাণু কেন্দ্রগুলোকে আলাদা করে গড়ে তুলতে হলে সম্পূর্ণ নব্য প্রযুক্তি, বাড়তি গবেষণা সংস্থা এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক লগ্নির প্রয়োজন, যা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির ওপর এক বিরাট বোঝা। মার্কিনরা মূলত এই চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মারফত ভারতের অভ্যন্তরীণ পরমাণু কার্যকলাপের ওপর স্থায়ী তদারকি বা নজরদারি কায়েম করতে চেয়েছিল, যাতে ভারত পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ করছে কি না বা কত সংখ্যায় করছে তা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
৮.২ ইরান বিতর্ক, গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প এবং ভারতের বৈদেশিক নীতির পরীক্ষা
ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত ও তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক মূল্য ভারতকে চোকাতে হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে তার দীর্ঘদিনের মিত্র রাষ্ট্র ইরানের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-বিরোধী ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কার্যত বলি দিতে হয়েছিল।
এই কূটনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে ছিল ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ইরান-পাকিস্তান-ভারত’ (IPI) গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প। ইরান থেকে পাকিস্তানের স্থলভাগের মধ্য দিয়ে পাইপলাইন মারফত ভারতে সুলভে প্রাকৃতিক জ্বালানি গ্যাস আমদানির যে প্রক্রিয়া চলছিল, মার্কিন চাপের জেরে তা চরমভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ওয়াশিংটন পরোক্ষভাবে স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরানের সাথে এই গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি বাতিল এবং ইরান প্রশ্নে মার্কিন অবস্থানকে সমর্থন করার ওপরই নির্ভর করছে ১৮ জুলাইয়ের পরমাণু চুক্তি অনুসারে ভারত তার পরমাণু চর্চার জন্য আমেরিকা থেকে আদৌ ইউরেনিয়াম জ্বালানি পাবে কি না।
শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অফ গভর্নরস-এর বৈঠকে ইরান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের কাছে ভারত সরকার নতি স্বীকার করে। এই নতি স্বীকারের রূপটি ছিল আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার তোলা আপত্তি ও অভিযোগগুলো বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া। আমেরিকা চেয়েছিল ইরানের পরমাণু চর্চার বিরুদ্ধে প্রস্তাব আসুক এবং বিষয়টি ভিয়েনার পরমাণু সংস্থা থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে (যেখানে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব) উত্থাপন করা হোক। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই ঐতিহাসিক ভোটাভুটিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের পরমাণু চর্চার বিষয়টি উত্থাপনের প্রস্তাবে ভারত তার দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ নীতি ত্যাগ করে সরাসরি আমেরিকার পক্ষে ভোট দেয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল এই যে, ওই একই বৈঠকে রাশিয়া ও চীনসহ তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য প্রধান রাষ্ট্রগুলো—এমনকি মার্কিন মিত্র পাকিস্তানও—আমেরিকার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ইরানের পক্ষ নিয়ে ভোটদান করেছিল বা নিরপেক্ষ থেকেছিল। তারা কেউই চায়নি যে নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের প্রসঙ্গটি উঠুক; কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ঐতিহাসিক মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ভারত তা চেয়েছিল এবং মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ভারতের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের বৈদেশিক রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে যেমন তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়, তেমনই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও (বিশেষত বামপন্থী ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে) প্রবল ঝড় ওঠে।
৮.৩ মার্কিন কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, হেনরি হাইড এবং চুক্তির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমালোচনা
২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু চর্চা সংক্রান্ত মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়ে ভারতের বৈদেশিক নীতির স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়ার পরও, ভারত বিশেষ কোনো কূটনৈতিক সুবিধা বা সামগ্রিক ‘মার্কিন প্রেম’ জয় করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে অচিরেই গভীর সন্দেহ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। খোদ মার্কিন মুলুকে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে নিজের দেশের জনসমর্থন ধরে রাখতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং সেই ব্যর্থতা ঢাকতেই ভারতকে পরমাণু চুক্তির প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে ভারতের এই সমর্থনের ফলেও মার্কিন আইনসভায় ভারতের প্রতি সহানুভূতির জোয়ার আসেনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং মার্কিন প্রশাসনের প্রশংসা কুড়িয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রনেতাদের একাংশের মন জয় করতে পারলেও, মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী সাংসদদের মন জয় করতে পারেননি। মার্কিন কংগ্রেসে ভারতের স্বাধীন পরমাণু গবেষণা ও অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিরোধিতা ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। মার্কিন আইনপ্রণেতারা আরও কিছু কঠোর শর্ত ও চুক্তি ভারতের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ভারতকে পাকিস্তানের মতো একটি অনুগত বা তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা চালান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের (House of Representatives) আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির প্রধান হেনরি হাইড (যাঁর নামানুসারে পরবর্তীতে ২০০৬ সালে বিতর্কিত ‘হাইড অ্যাক্ট’ বা Hyde Act প্রণীত হয়) প্রকাশ্যে জানান যে, ভারতের সাথে ঠিক কী কী শর্তসাপেক্ষে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের চুক্তি করা হয়েছে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের কাছ থেকে গোপন করে রাখা হয়েছে। প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের কথা মাথায় রেখে আমেরিকা যে কঠোর পরমাণু আইন তৈরি করেছিল, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ফলে সেই আইনের হাত থেকে ভারত আদৌ কতটা ছাড় পাবে, তা নিয়ে তখন থেকেই গভীর সংশয় দেখা দেয়। বস্তুত, ইরানের বিরুদ্ধে ভোটদানের মাধ্যমে মার্কিনিরা ভারতে একটি বাম-বিরোধী ও মার্কিন-অনুসারী বিদেশনীতিকে উৎসাহিত করতে চেয়েছিল, যদিও ভারতের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চাপে তাদের সেই স্বপ্ন সম্পূর্ণ সফল হয়নি।
ভারতের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই চুক্তির প্রবল সমালোচনা করা হয়। ভারতে মার্কিন-প্রেমীদের মুখে তখন আজব সব সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছিল যে, বিশ্বে গণতন্ত্রের প্রসার, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং মানবাধিকার সম্প্রসারণ প্রভৃতি প্রশ্নে নয়াদিল্লিকে ঘনিষ্ঠ সহযোগী করে তুলতে আমেরিকা অত্যন্ত আগ্রহী। কিন্তু সমালোচকরা সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন তোলেন যে, আমেরিকা যদি ভারতকে প্রকৃতই সমমর্যাদার সহযোগী মনে করে, তবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রশ্নে তারা নীরব কেন? আসলে আমেরিকা নিষেধাজ্ঞার ভয় ও জ্বালানির প্রলোভন দেখিয়ে ভারতের পরমাণু কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক কমিশনের (আইএইএ) পরিদর্শনের চুক্তিতে বাঁধতে চাইছিল। অথচ ওই আন্তর্জাতিক সংস্থার কোনো অধিকারই নেই তথাকথিত নিউক্লিয়ার ক্লাবের স্বীকৃত চার-পাঁচটি রাষ্ট্রের সামরিক পরমাণু কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করার। প্রতিবেশী চীন আপন সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সেই আন্তর্জাতিক কমিশনের এহেন একতরফা খবরদারিকে প্রত্যাখ্যান করেছে; কিন্তু ভারতের সেই সাধ্য বা দৃঢ়তা এই চুক্তিতে দেখা যায়নি, কারণ পরমাণু জ্বালানির জন্য ভারত মার্কিন করুণার প্রত্যাশী হয়ে পড়েছিল।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও মার্কিন পরমাণু রিঅ্যাক্টর ও জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তটি ছিল ভারতের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশেষজ্ঞদের মতে, চড়া দামে মার্কিন পরমাণু রিঅ্যাক্টর কেনার ফলে ভারতে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট ব্যয় অনেকখানি বেড়ে যাবে এবং মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলোর চড়া দামের প্রভাবে সুলভে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও দেশের সামগ্রিক প্রয়োজন থেকে ভারতকে সরে আসতে হবে। পরমাণু শক্তি গবেষণায় এবং নিজস্ব বিপুল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে থোরিয়াম-চালিত রিঅ্যাক্টর তৈরিতে ভারত যদি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হতে পারত, তবেই কেবল দেশবাসীর জন্য সুলভে বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হতো। কিন্তু দেশীয় প্রযুক্তিতে ব্যাপক লগ্নি না করে একরকমভাবে মার্কিন কৃপার ওপর নির্ভর করার ফলে ভারত তার প্রকৃত স্বনির্ভরতার লক্ষ্যের ধারেকাছেও আসতে পারবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এই কারণেই ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের (BARC) প্রাক্তন ডিরেক্টর ড. এ. এন. প্রসাদ এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন— “মার্কিন চুক্তি ভারতকে সাহায্য করার জন্য নয়, বরং ভারতের নিজস্ব পরমাণু কর্মসূচিকে প্রতিহত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।” সার্বিক বিচারে, ভারত-আমেরিকা পরমাণু চুক্তি যে ভারতের স্বনির্ভরতার পক্ষে খুব একটা লাভজনক হয়েছে, তা নিঃসংশয়ে বলা যায় না।
৮.৪ বহুমেরু বিশ্ব, চীন-রাশিয়া অক্ষ এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO)
ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির এই জটিল সমীকরণকে কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নিরিখে দেখলে চলবে না; একে বুঝতে হবে একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, যেখানে একমেরু বিশ্বের বদলে ‘বহুমেরু বিশ্ব’ (Multipolar World) গড়ে তোলার লড়াই শুরু হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের সময় আমেরিকার তীব্র নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ছিল বিশ্বে মার্কিন একাধিপত্য বজায় রাখা। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও আমেরিকা তার সামরিক শক্তি ও অস্ত্রখাতে ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি করে চলে, অথচ উল্টে চীনের ওপর দোষারোপ করতে থাকে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর জন্য। ইরাক, আফগানিস্তান এবং পরবর্তীতে ইরানের ওপর মার্কিন আগ্রাসী নীতি ও কূটনীতির জন্যই বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ আরও মারমুখী হয়ে ওঠে।
এই মার্কিন একাধিপত্যের বিপরীতে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত আঁতাত ওয়াশিংটনের ঘুম কেড়ে নেয়। একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুমেরু বিশ্ব আধুনিক মানব সভ্যতার কাম্য হলেও আমেরিকা বরাবরই তার পরিপন্থী। এমনকি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের একতরফা নীতির কারণে ইউরোপের দুই প্রধান শক্তি জার্মানি এবং ফ্রান্সও সর্বক্ষেত্রে আমেরিকাকে পূর্ণ সমর্থন দেয়নি।
এই ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান হয়ে ওঠে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারতের দীর্ঘতম সীমান্ত থাকা প্রতিবেশী দেশ হলো চীন, এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীনের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্রমাগত উন্নতি ঘটছিল। কিন্তু ভারত-মার্কিন পরমাণু সহযোগিতা চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারত, আমেরিকা এবং চীনকে নিয়ে গঠিত ত্রিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক প্রশ্নের দিকে তাকিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং আমেরিকার সাংবাদিক সম্মেলনে দাঁড়িয়েই বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তির ফলে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্কে কোনো অবনতি ঘটবে না এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনের সাথেও ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে ভারত সমানভাবে আগ্রহী।
বস্তুত, ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন হওয়া মানেই যে মার্কিন শক্তির কাছে ভারতের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ বা পরাজয় ঘটেছে, বিষয়টি তেমন একরৈখিক নয়। কারণ, একই সময়ে ইউরেশিয়া অঞ্চলে মার্কিন একাধিপত্যকে প্রত্যক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে রাশিয়া এবং চীনের জোট পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের আরও কয়েকটি মধ্য এশীয় রাষ্ট্রকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলে এক নতুন ও শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্রজোট—‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ (Shanghai Cooperation Organisation - SCO)। রুশ-চীন নেতৃত্বাধীন এই নতুন জোটটি যখন ভারত এবং ইরানকে তাদের সহযোগী ও সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার ব্যবস্থা করে (উল্লেখ্য, ২০০৫ সালেই ভারত ও ইরান এসসিও-তে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা পায় এবং পরবর্তীকালে ২০১৭ সালে ভারত ও ২০২৩ সালে ইরান এর পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে), তখন তা একমেরু বিশ্বে মার্কিন প্রাধান্যকে এক প্রবল কূটনৈতিক আঘাত দেয়। এভাবেই একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অসামরিক পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে প্রযুক্তিগত অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা এবং অন্যদিকে রাশিয়া-চীন-ইরানের সাথে বহুমেরু বিশ্বের মঞ্চে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার এক পিচ্ছিল ও জটিল কূটনৈতিক পথ ধরে ভারত একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে অগ্রসর হয়।