ভারতের পরমাণু চর্চা (সপ্তম পর্ব) : বৈশ্বিক পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার, দক্ষিণ এশীয় প্রতিযোগিতা ও অ-রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | | views :2 | like:0 | share: 0 | comments :0
১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পারমাণবিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ও সামরিক মানচিত্র চিরতরে বদলে যায়। ১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পর বিশ্বজুড়ে পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র নৈতিক প্রতিবাদ গড়ে উঠলেও, বিদেশি শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার তাগিদে বিশ্বের প্রধান রাষ্ট্রগুলো সামরিক অস্ত্রসম্ভারে পারমাণবিক বোমা মজুত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থেকেছে। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর একচেটিয়া আধিপত্য, দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের গোপন পরমাণু কর্মসূচির বিকাশ, ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে অ-রাষ্ট্রীয় বা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর হাতে পরমাণু অস্ত্র চলে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
৭.১ বৈশ্বিক পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার: কার ভাণ্ডারে কত বোমা ও আধুনিকীকরণ
বিশ্বের কোন রাষ্ট্রের ভাণ্ডারে ঠিক কতগুলো পরমাণু বোমা মজুত রয়েছে, তা নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে, কারণ প্রতিটি রাষ্ট্রই তাদের কৌশলগত অস্ত্রভাণ্ডারের তথ্য চরম গোপনীয়তার সাথে রক্ষা করে। তবুও ঐতিহাসিক পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতার একটি তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই ভোর সাড়ে পাঁচটায় নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে মানব ইতিহাসের প্রথম পরীক্ষামূলক আণবিক বিস্ফোরণটি ঘটিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই শুরু থেকে পরবর্তী দশকগুলোতে আমেরিকা বহুবার বাস্তব পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পরবর্তীকালে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে প্রভূত উন্নয়ন হওয়ার ফলে মার্কিন বিজ্ঞানীদের হাতে আসে কম্পিউটার সিমুলেশন পদ্ধতিতে (সাব-ক্রিটিক্যাল টেস্ট) পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর অত্যাধুনিক সুযোগ। ২০০১ সালে আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের যমজ সৌধ দুটি সন্ত্রাসবাদী হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর, বিশ্ব থেকে সন্ত্রাসবাদ দূর করার অজুহাতে মার্কিন সামরিক খাতে পারমাণবিক চর্চা আরও দ্রুততর হয়েছে। কেবল পারমাণবিক বোমাই নয়, সেই বোমা বহনকারী অত্যাধুনিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও মার্কিন সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে বিপুল সংখ্যায় শামিল হয়েছে। আধুনিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান (যেমন স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা SIPRI-এর সাম্প্রতিকতম তথ্য) অনুযায়ী, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে অবসরপ্রাপ্ত ও মজুত মিলিয়ে মোট প্রায় ৫,০০০-এর বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১,৭৭০টি ওয়ারহেড সার্বক্ষণিক সক্রিয় বা মোতায়েন (Deployed) অবস্থায় রাখা হয়েছে।
- রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বমঞ্চে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ১৯৪৯ সালে সফল পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সংখ্যাগত দিক থেকে রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডারে মার্কিনিদের থেকেও বেশি পারমাণবিক বোমা মজুত রয়েছে। তবে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি অনুযায়ী তাদের বহু বোমা বর্তমানে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রাখা আছে। তা সত্ত্বেও, রাশিয়ার বোমা বহনকারী আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত ও মারাত্মক। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার কাছে বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে, যার মোট সংখ্যা প্রায় ৫,৫০০-এর কাছাকাছি এবং এর মধ্যে প্রায় ১,৭১০টি ওয়ারহেড সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করা রয়েছে।
- ব্রিটেন: ১৯৫২ সালে ব্রিটেন তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর বহুবার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানোর পর ব্রিটেন উন্নত মানের পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষেত্রে পূর্ণ সফলতা লাভ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার তুলনায় ব্রিটেনের অস্ত্রভাণ্ডারে পরমাণু বোমার সংখ্যা কম হলেও, তাদের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী বেশ কিছু বোমা (বর্তমানে প্রায় ২২৫টি ওয়ারহেড, যা মূলত সাবমেরিন-ভিত্তিক ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় যুক্ত) মজুত রয়েছে।
- ফ্রান্স: ইউরোপের অপর পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ফ্রান্স ১৯৬০ সালে তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণটি ঘটায়। ব্রিটেনের মতোই ফ্রান্সের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারেও নির্দিষ্ট কিন্তু অত্যন্ত আধুনিক কিছু পরিমাণে পারমাণবিক বোমা (বর্তমানে প্রায় ২৯০টি ওয়ারহেড) স্থান পেয়েছে।
- চীন: তৃতীয় বিশ্বের এবং এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনই প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ১৯৬৪ সালে। চীনের অস্ত্রভাণ্ডারে অনেকগুলো পারমাণবিক বোমা মজুত রয়েছে এবং তাদের বোমা বহনকারী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও যথেষ্ট উন্নত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তাদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্প্রসারণ করছে এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রাক্কলন অনুযায়ী তাদের কাছে থাকা পরমাণু ওয়ারহেডের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে ৬০০-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
- ইসরায়েল ও অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি: স্বীকৃত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অবস্থান অত্যন্ত রহস্যময়। সংখ্যায় কম হলেও আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিতভাবে মনে করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে ইসরায়েলের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে পারমাণবিক বোমা (আনুমানিক ৯০টি ওয়ারহেড) স্থান পেয়েছে; যদিও কৌশলগত অস্পষ্টতার নীতি অনুসরণ করে ইসরায়েল নিজেকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয়নি। এছাড়াও বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে লিবিয়া, ইরান ও গণতান্ত্রিক কোরিয়া (উত্তর কোরিয়া)-এর ভাণ্ডারে গোপনে পরমাণু বোমা রয়েছে; যদিও ২০০৫ সাল পর্যন্ত এসবের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে হালনাগাদ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, লিবিয়া তাদের প্রারম্ভিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করলেও এবং ইরানের কর্মসূচি নিয়ে আজও কূটনৈতিক টানাপোড়েন চললেও, উত্তর কোরিয়া পরবর্তীকালে (২০০৬ সাল থেকে) একাধিকবার প্রকাশ্য পরমাণু পরীক্ষা চালিয়ে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলেছে।
৭.২ দক্ষিণ এশীয় প্রতিযোগিতা ও পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচির নেপথ্য ইতিহাস
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচি ছিল সম্পূর্ণভাবে ভারত-কেন্দ্রিক এবং পশ্চিমা বিশ্বের পরোক্ষ প্রশ্রয়ে লালিত। ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারতের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর ঠিক পরেই ২৮ মে পাকিস্তানে প্রথমবার প্রকাশ্য পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কিন্তু পাকিস্তানের এই পরমাণু বোমা তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছিল মূলত ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকেই। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের সামরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর, ভারতের প্রচলিত সামরিক প্রাধান্যের মোকাবিলা করতে পাকিস্তান যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানের এই পারমাণবিক কর্মসূচির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন পাকিস্তানি পরমাণু বিজ্ঞানী মুনির আহমেদ খান, যিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাপ্রাপ্ত একজন দক্ষ নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার। এছাড়া অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনে (IAEA) দীর্ঘদিন কাজ করার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল। সত্তরের দশকে পাকিস্তানে পারমাণবিক চর্চার প্রাথমিক পরিকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ প্রযুক্তিবিদ গড়ে তোলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্স উভয়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পর মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব হেনরি কিসিঙ্গার পাকিস্তানকে নতুন সামরিক সাহায্যের বন্দোবস্ত করে দেন এবং ফ্রান্সের সাহায্যে পাকিস্তানে একটি প্লুটোনিয়াম চুল্লি স্থাপনের ব্যবস্থাও করা হয়।
তবে পাকিস্তানে পারমাণবিক বোমা নির্মাণের বাস্তব ও চূড়ান্ত সাফল্যের পেছনে ধাতুবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল কাদের খানের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। প্লুটোনিয়াম পথের পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের (Uranium Enrichment) গোপন পথ বেছে নেন আব্দুল কাদের খান। তিনি ডাচ (নেদারল্যান্ডস) উৎস থেকে গোপন কারিগরি সহায়তা ও নকশা সংগ্রহ করেন এবং পারমাণবিক কাজকর্মে পারদর্শী ইউরোপীয় বহুজাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘ইউরোপিয়ান ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট কোম্পানি’ (URENCO)-এর প্রযুক্তি ও সংযোগকে কাজে লাগিয়ে গোপনে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের পশ্চিমে কাহুটা অঞ্চলে এক বিশাল পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতা ছিল এই যে, কাহুটা কেন্দ্রের এই গোপনীয়তা বিশ্বের সাধারণ সংবাদ জগতে বজায় থাকলেও মার্কিন প্রশাসনের কাছে তা নিশ্চিতভাবেই অজানা ছিল না। এমনকি আন্তর্জাতিক পরমাণু তদারকি সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন’ (IAEA)-এর কাছেও পাকিস্তানের এই গোপন তৎপরতা অজানা ছিল না; কিন্তু সংস্থাটি মূলত মার্কিন কূটনীতির প্রভাবেই নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এবং আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র হওয়ায় ওয়াশিংটন জেনেবুঝেও পাকিস্তানের এই পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে গিয়েছিল।
৭.৩ ভারতের কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি
উত্তরে চীন এবং পশ্চিমে পাকিস্তানের মতো দুটি পরমাণু অস্ত্রধর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপস্থিতির কারণে ভারতকে তার নিজস্ব কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘ক্রেডিবল মিনিমাম ডিটারেন্স’ (Credible Minimum Deterrence) গড়ে তুলতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালে প্রথম পরমাণু বিস্ফোরণ এবং তার চব্বিশ বছর পর ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয় দফার সফল বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভারত তার পারমাণবিক অস্ত্রের নকশা ও কার্যকারিতা সম্পূর্ণ প্রমাণ করেছে। প্রদত্ত ঐতিহাসিক প্রাক্কলন ও সমসাময়িক সক্ষমতা মিলিয়ে ভারতের ভাণ্ডারে মজুত ও সম্ভাব্য পরমাণু বোমার সংখ্যা ২০০ থেকে ২৫০-এর কাছাকাছি (সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সমীক্ষা অনুযায়ী বর্তমানে ভারতের কাছে প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০টি সক্রিয় কৌশলগত নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড এবং পর্যাপ্ত অস্ত্র-গ্রেড প্লুটোনিয়াম মজুত রয়েছে)।
তবে বিপুল পরমাণু সক্ষমতা অর্জন করলেও ভারত বরাবরই একটি অত্যন্ত দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় দিয়েছে। ১৯৯৮ সালের পরীক্ষার পরেই তৎকালীন প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানী ও পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আব্দুল কালাম স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, ভারত স্বেচ্ছায় আর নতুন কোনো পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটবে না এবং ভারতের পক্ষ থেকে কখনোই কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের প্রথম প্রয়োগ (No First Use - NFU) করা হবে না। ভারতের পরমাণু নীতি সম্পূর্ণভাবে আত্মরক্ষামূলক—অর্থাৎ ভারতের ওপর যদি কোনো পারমাণবিক আঘাত আসে, তবেই কেবল ভারত তার চূড়ান্ত প্রত্যুত্তর দেবে।
কেবল পরমাণু বোমা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, শত্রুপক্ষের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে সেই বোমা নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী বাহন বা ডেলিভারি সিস্টেম। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন চর্চার ফলে ভারত কেবল পরমাণু বোমা নয়, বরং বোমা বহনকারী দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণেও সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। যদিও ভারত যখনই নিজস্ব প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে চেয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখনই তার বিরোধিতা করেছে; তবুও ড. আব্দুল কালামের নেতৃত্বে ভারতের ‘ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ (IGMDP) অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে।
ভারতের পরমাণু বোমা বহনকারী সর্বাধুনিক ও সর্বোচ্চ পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘অগ্নি-৫’ (Agni-V)। ৫,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার এই অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র সমগ্র এশিয়া এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার একাংশকে ভারতের প্রতিরক্ষা বলয়ের আওতায় নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিকতম প্রযুক্তির সংযোজনে (যেমন ‘মিশন দিব্যাস্ত্র’-এর মাধ্যমে অর্জিত MIRV বা মাল্টিপল ইন্ডিপেন্ডেন্টলি টার্গেটেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকেল প্রযুক্তি) একটি মাত্র অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যেই একসাথে একাধিক পরমাণু বোমা ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করার সক্ষমতা ভারত অর্জন করেছে। স্থলভিত্তিক ‘পৃথ্বী’ ও ‘অগ্নি’ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ভারত সমুদ্রের নিচে চলাচলকারী দেশীয় প্রযুক্তির পারমাণবিক ডুবোজাহাজ (যেমন—আইএনএস অরিহন্ত ও আইএনএস আরিঘাত) এবং সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক মিসাইল (SLBM) তৈরি করে তার ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ (Nuclear Triad—স্থল, আকাশ ও জলপথ থেকে পরমাণু হামলার সক্ষমতা) সম্পূর্ণ করেছে।
৭.৪ অ-রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি অধিকারে পরমাণু বোমা: সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি ও ভূ-রাজনৈতিক সত্যতা
একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে সবচেয়ে বড় যে আতঙ্কটি দেখা দেয়, তা হলো কোনো রাষ্ট্রের বাইরে বেসরকারি বা সন্ত্রাসবাদী সংস্থার হাতে পরমাণু অস্ত্র চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। ২০০৫ সালের ২০ আগস্ট ভারতের সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (PTI) এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানায় যে, মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক কর্তাদের আশঙ্কা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংস্থা আল-কায়েদার হাতে পরমাণু বোমা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI)-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা ও পরামর্শদাতা পল উইলিয়ামস (Paul L. Williams) এই দাবিটি করেছিলেন, যা মূলত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের অনুমোদনের বাইরে ছিল না। পিটিআই-এর ওই খবরে আরও বলা হয়েছিল যে, পরমাণু অস্ত্র প্রযুক্তির জন্য আল-কায়েদা প্রাক্তন রুশ ও পাকিস্তানি পরমাণু বিজ্ঞানীদের কাজে লাগিয়েছে।
এর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ২০০৫ সালের ২১ আগস্ট কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল: “ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে খান চল্লিশেক পারমাণবিক অস্ত্র জোগাড় করেছিল আল-কায়েদা। এর মধ্যে সুটকেস বোমা, পারমাণবিক মাইন ইত্যাদি ছোট বিস্ফোরক আছে। এমনকি ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। তাদের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের অন্তত অর্ধেক চেচেন জঙ্গিদের কাছ থেকে কেনা।”
কিন্তু পিটিআই-এর নামে প্রচারিত এই চাঞ্চল্যকর সংবাদটি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণের নিরিখে মোটেই সংশয়াতীত নয়। প্রথমত, আল-কায়েদা সংস্থাকে কারা এবং কীভাবে একটি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলেছিল, সেই ঐতিহাসিক তথ্য অনেক আগেই প্রকাশিত এবং বিশ্বজুড়ে সুবিদিত। আশির দশকে সমাজতান্ত্রিক আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট বিরোধী হামলায় ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা এবং মুজাহিদিন গোষ্ঠীকে স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই (পাকিস্তানের মাধ্যমে) সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্র সাহায্যে শক্তিশালী করে তুলেছিল। পরবর্তীকালে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে সেই পুরনো ইতিহাসকেই নতুন করে সাজিয়ে এফবিআই কর্মকর্তারা বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়াতে প্রচার করেছেন।
দ্বিতীয়ত, ওই প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে গুরুতর কালানুক্রমিক ও যৌক্তিক অসঙ্গতি রয়েছে। রাশিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী চেচেন জঙ্গিদের হাতে যদি সত্যিই কুড়ি-চল্লিশটি সচল পরমাণু অস্ত্র বা সুটকেস বোমা মজুত থাকত, তবে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে রুশ বা সোভিয়েত শাসকদের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার না করে আল-কায়েদার কাছে বিক্রি করতে যাবে কেন—সেই মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায়। তা ছাড়া ঐতিহাসিক কালানুক্রম দেখলে দেখা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯৯০-৯১ সালের দিকে, আর একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক হিসেবে আল-কায়েদার পূর্ণাঙ্গ উৎপত্তি ও বিস্তার ঘটে মূলত ১৯৯৪ সালের দিকে বা তার কাছাকাছি সময়ে; ফলে ঠান্ডা লড়াই চলাকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে আল-কায়েদার অস্ত্র কেনার দাবিটি অত্যন্ত দুর্বল। বস্তুত, সন্ত্রাসবাদ দূরীকরণের অজুহাতে আমেরিকা যেভাবে ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়েছে, তার নৈতিক বৈধতা আদায়ের কৌশল হিসেবেই এ ধরনের প্রচার চালানো হয়েছিল।
তবে মার্কিন গোয়েন্দাদের এই প্রচারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও, অ-রাষ্ট্রীয় বা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর হাতে পারমাণবিক উপাদান পৌঁছানোর ঝুঁকিটিকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ইউরোপীয় বেসরকারি বহুজাতিক সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট কোম্পানি’ (URENCO) কিংবা মার্কিন বহুজাতিক ‘জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি’ (General Electric Company)-এর মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে সংবেদনশীল পারমাণবিক প্রযুক্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত এবং মুনাফার কারণে যেভাবে কালোবাজারে প্রযুক্তির আদান-প্রদান ঘটেছে (যেমন আব্দুল কাদের খানের চোরাচালান নেটওয়ার্ক), তাতে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংস্থার হাতে রেডিওলজিক্যাল বা পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান মজুত থাকার সন্দেহের অবকাশ কিছুটা থেকেই যায়। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্বে রাসায়নিক, জৈবিক ও পারমাণবিক অস্ত্রের গোপন উৎপাদন এবং সন্ত্রাসবাদের বিস্তার যে মানব সভ্যতার জন্য এক চরম অমঙ্গলজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা অনস্বীকার্য।