ভারতের পরমাণু চর্চা (ষষ্ঠ পর্ব) : দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ও দ্বিতীয় পোখরান পরীক্ষা (১৯৮০–১৯৯৮)
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | | views :2 | like:0 | share: 0 | comments :0
প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের পরমাণু গবেষণা থেমে থাকেনি। আশির দশকের শুরু থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত সময়কালটি ছিল ভারতের পরমাণু ইতিহাসে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে দ্বিতীয়বার পোখরান বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেশের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানকে সুদৃঢ় করার এক নির্ণায়ক অধ্যায়।
৬.১ আশির দশকে পরমাণু চর্চার পুনরুজ্জীবন এবং ঠান্ডা যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ
১৯৭৪ সালের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে ভারতের পরমাণু কর্মসূচিতে সাময়িকভাবে কিছুটা ঢিলেমি দেখা দিয়েছিল। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে ওয়াশিংটনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই জানিয়েছিলেন যে, ভারত পরমাণু প্রসারণ বিরোধী চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর দেবে এবং দেশের পরমাণু সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার পরিদর্শনের আওতায় রাখবে। কিন্তু তাঁর সহযোগী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদদের তীব্র বিরোধিতার কারণে সেই ঘোষণা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে পারেনি।
এরপর ১৯৮০ সালে ভারতে পরমাণু চর্চায় পুনরায় নতুন জোয়ার আসে। মার্কিন পক্ষ থেকে ভারতের এই অগ্রগতি নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা থাকলেও কৌশলগত কারণে সাধারণ মানুষের জ্ঞাতার্থে ভারতের পরমাণু চর্চার এই বিকাশ তখন খুব বেশি প্রচার পায়নি। প্রথম পোখরানের পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বিন্দুমাত্র দমে যাননি। দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে তিনি ১৯৮০ সালে রাশিয়ার সাথে ১৬৩ কোটি ডলার মূল্যে সমরাস্ত্র কেনার চুক্তি সম্পাদন করেন।
ভারতের এই স্বাধীন পদক্ষেপের বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার নীতি গ্রহণ করে। ১৯৮১ সালে মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানকে ২৫০ কোটি ডলার মূল্যে যুদ্ধাস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে বলে জানায় এবং এর ঠিক তিন মাস পরেই ওই সহায়তার মূল্য বেড়ে প্রায় ৩২০ কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক মঞ্চেও ভারত মার্কিন অসহযোগিতার সম্মুখীন হয়; ভারত যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ৫৮০ কোটি ডলার ঋণ চায়, তখন আমেরিকা তার সরাসরি বিরোধিতা করে।
৬.২ তারাপুর জ্বালানি সংকট, মার্কিন শিথিলতা প্রত্যাখ্যান এবং দেশীয় চুল্লির বিস্তার
ক্রমাগত ভারত বিরোধিতার ফলে ভারত প্রবলভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকছে দেখে শেষ পর্যন্ত মার্কিন কর্মকর্তাদের টনক নড়ে। এই ভূ-রাজনৈতিক দুশ্চিন্তা থেকে তৎকালীন মার্কিন রিগান প্রশাসন ভারতের তারাপুর চুল্লির জ্বালানির বিষয়ে কিছুটা শিথিলতা দেখায় এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের পর নিউক্লিয়ার শক্তি বা জ্বালানি সরবরাহ করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
বৈদেশিক জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কাটাতে ভারত থোরিয়াম ও প্লুটোনিয়ামের অভাবের ফাঁক ভরাট করার প্রচেষ্টা শুরু করে এবং পরমাণু শক্তি চর্চায় বাজেটের খরচ ও কর্মনিয়োগ বাড়িয়ে দেয়। তারাপুর চুল্লির জ্বালানি সংকট মেটাতে ১৯৮২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ফ্রান্সের সঙ্গে পরমাণু বিষয়ে ভারতের নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বস্তুত, ড. হোমি ভাবার পরবর্তী সময়ে ভারতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য আর বৈদেশিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি, কারণ ভারতীয় কারিগর এবং বিজ্ঞানীরা ততদিনে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করে নিয়েছিলেন। হাতে-কলমে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ দেশীয় পারমাণবিক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন এবং নতুন ধরনের ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর বা চুল্লি উদ্ভাবনে সক্ষম হন। আশির দশকে ভারতের নিজস্ব পরমাণু প্রকল্পের অধীনে মাদ্রাজের কলপাক্কামে দুটি জল সমন্বিত চুল্লি প্রস্তুত হয়ে যায় এবং ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ সালে এই প্রস্তুতি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালে নারোরা অঞ্চলে একই মাপের আরও দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মিত হয়। এছাড়াও বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাইগাতে দুটি ও রাজস্থানের কোটা অঞ্চলে দুটি চুল্লি নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলে এবং তারাপুর, রাজস্থান, কাইগা ও কুদানকুলামে আরও বারোটি নতুন চুল্লি বসানোর পরিকল্পনা গৃহীত হয়। সামগ্রিকভাবে আশির ও নব্বইয়ের দশকে ভারত পরমাণু শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে পারমাণবিক স্বনির্ভরতায় অনেকটা এগিয়ে আসে, যা পরবর্তীকালে চূড়ান্ত পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর সামর্থ্যকে ত্বরান্বিত করে।
৬.৩ সোভিয়েত চুল্লির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং নব্বইয়ের দশকের কূটনৈতিক টানাপোড়েন
আশির দশকে চীনের মতোই ভারতের ক্ষেত্রেও রাশিয়া পরমাণু শক্তির বিকাশ এবং শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে রাশিয়া ভারতে ৪৪০ মেগাওয়াটের ইউরেনিয়াম চালিত দুটি লাইট ওয়েট রিঅ্যাক্টর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেই সময় ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের অধিকর্তা ড. রাজা রমান্না রাশিয়ার এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ড. রমান্নার সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেদের দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমেই এমন চুল্লি তৈরি করে নিতে পারবেন এবং বৈদেশিক সহায়তা না নিলে ভারতের পরমাণু গবেষণার গোপনীয়তা সম্পূর্ণ বজায় থাকবে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর ভারত-মার্কিন সম্পর্কে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। সামরিক ও পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরবর্তীতে যৌথ সামরিক মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়। এই চুক্তির পরেই জানা যায় যে, ভারতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য আমেরিকা তৎপর হয়েছে এবং ভারতকে সামরিক অস্ত্র বিক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু মার্কিন এই নমনীয়তার আড়ালেও ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল; কারণ ভারত যখনই নিজস্ব প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে চেয়েছে, আমেরিকা তখনই তার তীব্র বিরোধিতা করেছে।
৬.৪ পোখরান-২ (১৯৯৮)-এর নেপথ্য প্রস্তুতি: বিজ্ঞানীদের ভূমিকা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
পারমাণবিক বিস্ফোরণ এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্ত করার জন্য ভারতীয় বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ বহুদিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন চর্চা চালিয়ে গিয়েছিলেন। এই সাধনার ফলেই তাঁরা কেবল পরমাণু বোমা নয়, বরং পরমাণু বোমা বহনকারী দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রও নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সমর্থনে ভারতে দ্বিতীয়বার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর গোপন প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী রাও এই বিষয়ে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. রাজাগোপাল চিদম্বরম এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থার (ডিফেন্স রিসার্চ) তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা ও পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আব্দুল কালামের মাধ্যমে। ড. কালাম ইতিমধ্যেই দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছিলেন যে, ভারত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে। প্রকাশ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা বিষয়ক কোনো বার্তা না দিলেও, দেশের পরমাণু বিজ্ঞানীসহ ড. আব্দুল কালামের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর পরমাণু চর্চা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রবল চাপ ছিল।
পরবর্তীকালে নরসিমা রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পর কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে, সেই সরকারের ওপরেও পরমাণু সংক্রান্ত বিষয়ে মুক্ত জ্ঞান চর্চার পথ খোলা রাখার জন্য যথেষ্ট চাপ ছিল। বাজপেয়ীর সরকার নিজেও পরমাণু বিষয়ে যথেষ্ট তৎপর ছিল। বাস্তবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদবানির সহায়তায় দেশে ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করা হয়। ঠিক একই সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানও পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য পাল্টা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
৬.৫ মে ১৯৯৮-এর চূড়ান্ত বিস্ফোরণ, পাকিস্তানের প্রত্যুত্তর এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
সমস্ত গোপন প্রস্তুতি শেষে ১৯৯৮ সালের ১১ মে রাত তিনটে ৪৫ মিনিটে রাজস্থানের পোখরান মরুভূমিতে ভারতের দ্বিতীয়বার পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানো হয় এবং এর দুদিন বাদে আরও দুটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। খুব বড় ধরনের বিস্ফোরণ না হলেও এর প্রবল কম্পনের প্রভাবে পোখরানের কাছাকাছি গ্রামগুলোর বাড়িঘরের দেওয়ালে ফাটল ধরে। রাষ্ট্রীয় ও সামরিক নিরাপত্তার স্বার্থে সমগ্র বিষয়টি অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল; বিস্ফোরণ ঘটানোর পরেই দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর বাসভবনে সংবাদ দেওয়া হয়। গোপনীয়তার মাত্রা এতটাই কঠোর ছিল যে, দেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভারতের সেনা অধিনায়করাও এই বিস্ফোরণের মাত্র একদিন আগে বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন।
পরদিন অত্যন্ত ঘটা করে সংবাদমাধ্যমে এই পারমাণবিক পরীক্ষার খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে তীব্র মার্কিন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে ভারতের পক্ষ থেকে ড. এপিজে আব্দুল কালাম স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, ভারত আর নতুন কোনো পরমাণু বিস্ফোরণ করবে না এবং ভারতের পক্ষ থেকে কখনোই পরমাণু অস্ত্রের প্রথম প্রয়োগ করা হবে না।
ভারতের এই পরীক্ষার প্রত্যুত্তরে ১৯৯৮ সালের ২৮ মে বালুচিস্তানের চাঘাই মরুভূমিতে পাকিস্তান পাঁচটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের এই পাল্টাপাল্টি পরমাণু পরীক্ষার পর ১৯৯৮ সালের ১৮ জুন তৎকালীন মার্কিন ক্লিনটন প্রশাসন একযোগে দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ঘোষণা করে। ভারতের ওপর আরোপিত এই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রধান বিষয়টি ছিল এই যে, এর ফলে ভারত ১১ কোটি ৭০ লক্ষ ডলারের বৈদেশিক ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু এই আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ভারতের পারমাণবিক স্বনির্ভরতা ও কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারেনি।