ভারতের পরমাণু চর্চা (পঞ্চম পর্ব) : প্রথম পোখরান বিস্ফোরণ (১৯৭৪) এবং স্বনির্ভরতার সংগ্রাম (১৯৬৬–১৯৮০)

Tushar Gorai


Nov. 1, 2026 | | views :2 | like:0 | share: 0 | comments :0

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সত্তরের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত ভারতের পরমাণু কর্মসূচির ইতিহাস ছিল তাত্ত্বিক গবেষণাগার থেকে ব্যবহারিক প্রয়োগে উত্তরণ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। ১৯৬৪ সালে প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীনের পরমাণু বোমা পরীক্ষা এবং ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ভারতকে কেবল শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে দেয়নি। জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজেদের সার্বভৌম অবস্থান সুদৃঢ় করার তাগিদে ভারত গোপনে পারমাণবিক বিস্ফোরণ প্রযুক্তির চর্চা শুরু করে, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৪ সালের ১৮ মে রাজস্থানের পোখরান মরুভূমিতে।

৫.১ গোপন প্রস্তুতি, ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্ব এবং ‘পূর্ণিমা’ চুল্লির ভূমিকা

১৯৬৬ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রীমতী গান্ধী প্রকাশ্য নীতিগত অবস্থানে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বানানোর বিপক্ষে ছিলেন, যার প্রমাণ মেলে ১৯৬৮ সালের ২৮ এপ্রিল লোকসভায় প্রদত্ত তাঁর এক বিবৃতি থেকে। কিন্তু একই সাথে তিনি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বৈষম্যমূলক পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তি বা এনপিটি (NPT) স্বাক্ষরেরও ঘোর বিরোধী ছিলেন। কারণ, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হাতে ইতিমধ্যেই পরমাণু বোমা মজুত থাকায় ভারতের পক্ষে নিজেদের পরমাণু গবেষণার পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া সম্ভব ছিল না।

এই কৌশলগত বাস্তবতায় কেবলমাত্র উচ্চতর পারমাণবিক পারদর্শিতা অর্জনের জন্য ভারতে গোপনে পারমাণবিক বিজ্ঞানের বিশেষ চর্চা শুরু হয়। ১৯৬৮ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. রাজাগোপাল চিদম্বরমের নেতৃত্বে পরমাণু বিস্ফোরক তৈরি করার অত্যন্ত গোপন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এই বিশেষ প্রকল্পে প্রায় ৭৫ জন দক্ষ ভারতীয় বিজ্ঞানীকে নিযুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে ড. হোমি ভাবার প্রয়াণের পর অ্যাটমিক এনার্জি বিভাগের প্রধান হওয়া ড. বিক্রম সারাভাই পরমাণু বোমা বানানোর বিরোধী থাকলেও, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় অধিকর্তারা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই সক্ষমতা অর্জনের পক্ষে ছিলেন। ১৯৭১ সালের শেষভাগ থেকেই ভারতের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ পরমাণু বিস্ফোরণ (Peaceful Nuclear Explosion - PNE) ঘটানোর প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ পেতে থাকে।

এই গোপন প্রস্তুতির পর্বে ভারতের পারমাণবিক গবেষণার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত মাইলফলক ছিল ‘পূর্ণিমা’ (PURNIMA - Plutonium Reactor for Neutronic Investigations in Multiplying Assemblies) চুল্লি স্থাপন। প্লুটোনিয়াম জ্বালানি ব্যবহার করে দ্রুতগতির নিউট্রন বিভাজন (Fast Neutron Fission) সংক্রান্ত জটিল পদার্থবিদ্যার হিসাব-নিকাশ ও ক্রিটিক্যাল ভরের (Critical Mass) নিখুঁত পরিমাপের জন্য এই গবেষণা চুল্লিটি অপরিহার্য ছিল। কোটার (ও ট্রম্বে কেন্দ্রের) এই পূর্ণিমা চুল্লি স্থাপনের ফলে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের হাতে পরমাণু বিস্ফোরণের প্রযুক্তি সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ তথ্য ও প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির বাস্তব সুবিধা চলে আসে। বস্তুত, ১৯৭৪ সালে সংঘটিত প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের সাফল্যের পেছনে এই পূর্ণিমা চুল্লির প্রযুক্তিগত কার্যকারিতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৫.২ ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

সত্তরের দশকের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দমন-পীড়ন এবং ভারতে এক কোটিরও বেশি শরণার্থীর আগমনের প্রেক্ষাপটে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঙ্গার প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং ভারতকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালান। এমনকি যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারতকে ভয় দেখাতে মার্কিন সপ্তম নৌবহর (USS Enterprise—যা নিজেই একটি পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ছিল) বঙ্গোপসাগরে প্রেরণ করা হয়েছিল।

এই সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মার্কিন সামরিক চাপ আগেভাগেই আঁচ করতে পেরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এক সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের একটি ঐতিহাসিক দীর্ঘকালীন সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের চুক্তি (Indo-Soviet Treaty of Peace, Friendship and Cooperation) স্থাপিত হয়। এই চুক্তির ফলে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে এবং সামরিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ সমর্থন ভারতের পক্ষে নিশ্চিত হয়।

অতঃপর ১৯৭১ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সংঘটিত ভারত-পাক যুদ্ধে ভারতের প্রত্যক্ষ সামরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সম্পূর্ণ মার্কিন বিরোধিতা উপেক্ষা করে অর্জিত এই ঐতিহাসিক বিজয়ে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে নিক্সন ও কিসিঙ্গারের কূটনৈতিক খেলায় ছেদ পড়ে যায় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও উল্লেখযোগ্য স্থান রচিত হয়। কিন্তু যুদ্ধের পর পরাজিত পাকিস্তানকে পুনরায় শক্তিশালী করতে নিক্সনের আমেরিকা পাকিস্তানকে ব্যাপক পরিমাণে সামরিক ও অর্থ সাহায্য করতে শুরু করে। ভারতের সামরিক সম্ভারের সঙ্গে পাকিস্তানের সমতা আনার এই মার্কিন প্রচেষ্টা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ পাওয়া যায় প্রখ্যাত কূটনৈতিক বিশ্লেষক ভি. পি. দত্ত (V. P. Dutt) লিখিত ‘ইন্ডিয়াস ফরেন পলিসি’ (India's Foreign Policy) নামক গ্রন্থে।

মার্কিন-পাকিস্তান-চীন অক্ষের এই ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত পরমাণু বোমা বা বিস্ফোরক তৈরির জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ঠিক পরেই, ১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় বিজ্ঞানীদের পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রয়াসে চূড়ান্ত অনুমোদন ও সায় প্রদান করেন।

৫.৩ পোখরান-১ (১৮ মে ১৯৭৪): ‘বুদ্ধ হাসছেন’ ও পরমাণু মানচিত্রে ভারতের উত্থান

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সবুজ সংকেত পাওয়ার পর ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. হোমি এন. শেঠনা, ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের (BARC) অধিকর্তা ড. রাজা রমান্না এবং ড. রাজাগোপাল চিদম্বরমের মতো শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত গোপনে পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। কানাডার সহায়তায় নির্মিত ট্রম্বের ‘সাইরাস’ (CIRUS) চুল্লি থেকে প্রাপ্ত প্লুটোনিয়াম-২৩৯ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয় একটি জটিল ‘ইমপ্লোশন’ (Implosion) ঘরানার পারমাণবিক ডিভাইস।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন—১৯৭৪ সালের ১৮ মে (বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন)। রাজস্থানের থর মরুভূমির অন্তর্গত পোখরান সেনা ছাউনির লুহুরকি গ্রামের কাছে মাটির নিচে (ভূ-গর্ভে) ভোর আটটা পাঁচ মিনিটে ঘটানো হয় ভারতের প্রথম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ। সাংকেতিকভাবে ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’ (Smiling Buddha) বা ‘বুদ্ধ হাসছেন’ নামে পরিচিত এই বিস্ফোরণটির ক্ষমতা ছিল প্রায় ১২ কিলোটন টিএনটি (TNT)-এর সমতুল্য, যা মরুভূমির বুকে এক প্রবল ঝড়ের ধাক্কার সমান কম্পন সৃষ্টি করেছিল।

গোপন গবেষণার মাধ্যমে পোখরানে ঘটানো এই সফল বিস্ফোরণ বিশ্ববাসীকে চমকে দেয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চীন—অর্থাৎ তথাকথিত নিউক্লিয়ার ক্লাব) বাইরে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ভারত পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে। ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরীক্ষাকে সামরিক অস্ত্র পরীক্ষা না বলে ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ’ (Peaceful Nuclear Explosion) হিসেবে ঘোষণা করে।

৫.৪ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মার্কিন প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক অস্থিরতা

পোখরানের এই পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি মহলে তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। ভারতের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের সময় আমেরিকার এই তীব্র নিষেধাজ্ঞা ও ক্ষোভের মূল কারণ ছিল বিশ্বে নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বা একমেরু বিশ্ব ব্যবস্থা বজায় রাখার মানসিকতা। আমেরিকা নতুন পরমাণু আইন তৈরি করে, যার দ্বারা তারা অসহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেয় কারণ ভারত পরীক্ষামূলকভাবে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মঞ্চে ভারতকে শায়েস্তা করার জন্য প্রস্তাব তোলা হয় যে, যে সমস্ত দেশ এনপিটি (NPT) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি, তাদের বিশ্বব্যাংক (World Bank) থেকে কোনো ঋণ দেওয়া হবে না—যে প্রস্তাবের মূল লক্ষ্যবস্তুই ছিল ভারত।

সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ভারতের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর। ১৯৬৩ ও ১৯৬৬ সালের ভারত-আমেরিকা চুক্তি অনুযায়ী মহারাষ্ট্রের তারাপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লি দুটির জন্য আমেরিকা থেকে ভারতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চুক্তি অনুযায়ী যতটা ইউরেনিয়াম ভারত পাওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা আসেনি। পোখরানের বিস্ফোরণের পর শাস্তিস্বরূপ মার্কিন পারমাণবিক শক্তি কমিশনের তরফ থেকে ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. হোমি শেঠনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ভারতকে আর কোনো ইউরেনিয়াম জ্বালানি পাঠানো হবে না।

অন্যান্য পাশ্চাত্য ও মিত্র দেশগুলোও ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। পোখরানের ঘটনার পর জাপান ও ব্রিটেন ভারতকে প্রদেয় আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে, কানাডা (যাদের সহযোগিতায় সাইরাস ও রাওয়াতভাটা চুল্লি নির্মিত হয়েছিল) অভিযোগ তোলে যে তাদের দেওয়া শান্তিপূর্ণ গবেষণার চুল্লি থেকে প্রাপ্ত প্লুটোনিয়াম ভারত বিস্ফোরণে ব্যবহার করেছে, এবং এর জেরে কানাডা ভারতকে যে পরমাণু সংক্রান্ত কারিগরি সাহায্য দিচ্ছিল তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও ভারতের এই পরীক্ষার প্রতিক্রিয়াতেই ১৯৭৪ সালে মার্কিন নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ’ (NSG), যার মাধ্যমে এনপিটি-বহির্ভূত দেশগুলোতে যেকোনো পারমাণবিক প্রযুক্তি ও জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব হেনরি কিসিঙ্গার ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ভারতে পৌঁছে নিজের সম্পর্কে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সমালোচনামূলক প্রতিবেদনগুলো পড়ে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং নয়াদিল্লির ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স’ (Indian Council of World Affairs)-এর সভায় তাঁর সেই ক্ষোভ প্রকাশ্যেই উগরে দিয়েছিলেন। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার পরও তিনি তিন দিন দিল্লিতে অবস্থান করেন। কিন্তু ভারতের স্বাধীন পরমাণু নীতি পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন ক্রোধ আরও বৃদ্ধি পায় এবং কিসিঙ্গার ভারত থেকে ফিরেই পাকিস্তানকে নতুন সামরিক সাহায্যের বন্দোবস্ত করে দিয়ে আসেন। একই সাথে ভারতকে টেক্কা দিতে ফ্রান্সের সাহায্যে পাকিস্তানে একটি প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ চুল্লি (Plutonium Reprocessing Plant) স্থাপনের ব্যবস্থাও তখন করা হয়। এর আগে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকেই পাকিস্তান পরমাণু বোমা বানানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং এই কাজে আমেরিকা ও ফ্রান্স পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের পরিকাঠামো তৈরিতে এগিয়ে আসে।

৫.৫ প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন, ‘ধ্রুব’ চুল্লি এবং সত্তরের দশকের শেষভাগের পরিস্থিতি

বিদেশ থেকে প্রাপ্য সমস্ত পারমাণবিক সহযোগিতার পথ রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেলেও ভারত কিন্তু খুব বেশি বিপন্ন হয়নি। কারণ, ড. হোমি ভাবা এবং ড. মেঘনাদ সাহার প্রদর্শিত পথে চলে ভারত ইতিমধ্যেই পরমাণু চর্চায় অনেক বেশি অভ্যন্তরীণ স্বনির্ভরতা লাভ করেছিল। পোখরানের এই ঐতিহাসিক সাফল্য ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মনোবল, সাহস ও আত্মনির্ভরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরেনিয়াম সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত ১৯৭৫ সালেই মুম্বাইয়ের ট্রম্বেতে সম্পূর্ণ দেশীয় নকশায় ‘ধ্রুব’ (Dhruva) নামক একটি বৃহৎ গবেষণাধর্মী পরমাণু চুল্লির নির্মাণকাজ শুরু করে। ভারতের নিজস্ব খনিতে উচ্চমাত্রার পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকলেও, ভারতীয় বিজ্ঞানীরা কৌশল গ্রহণ করেন যে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ও দেশের বিপুল থোরিয়াম-২৩২ সম্পদের সাথে এক বিশেষ নিউক্লীয় সংযোজন ও রূপান্তর ক্রিয়ায় (Neutron Absorption and Beta Decay) এই ‘ধ্রুব’ চুল্লি থেকে বিশেষ জাতের কৃত্রিম ফিসাইল জ্বালানি ইউরেনিয়াম-২৩৩ এবং উচ্চমানের প্লুটোনিয়াম উৎপাদিত হবে। সুতরাং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম না পাওয়া গেলেও ভারতের পরমাণু গবেষণা ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচি যে বিশেষ কোনো অসুবিধার মধ্যে পড়বে না, তা নিশ্চিত হয়ে যায়।

তবে পোখরানে পরীক্ষামূলক পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানোর পর তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কথা মাথায় রেখে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের প্রকাশ্য পরমাণু অস্ত্র চর্চায় কিছুটা কৌশলগত ঢিলেমি লক্ষ্য করা যায়। যদিও দেশের পরমাণু বিজ্ঞানীরা গবেষণার কাজে প্রবলভাবে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন এবং ভারতের সামরিক কর্মকর্তারাও জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে আরও শক্তিশালী পরমাণু বোমা (থার্মোনিউক্লিয়ার বা হাইড্রোজেন বোমা) তৈরির পক্ষপাতী ছিলেন। অন্যদিকে, পরমাণু বিজ্ঞানের মৌলিক চর্চায় ভারত যথেষ্ট উন্নতি করলেও এই পর্বে পরমাণু থেকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আশানুরূপ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ, পরমাণু চুল্লি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক পরিকাঠামোগত খরচ ছিল অত্যন্ত বেশি এবং ভারতের তৎকালীন যোজনা কমিশনের (Planning Commission) কাছ থেকে এই খাতে প্রয়োজনীয় বাড়তি অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।

১৯৭৭ সালে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পালাবদল ঘটে এবং ইন্দিরা গান্ধীর পর জনতা পার্টির সরকার গঠিত হলে মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই জানিয়েছিলেন যে, ভারত কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, এমনকি শান্তিপূর্ণ বিস্ফোরণও ঘটাবে না; এবং তিনি ইঙ্গিত দেন যে ভারত পরমাণু প্রসারণ বিরোধী চুক্তিতে (NPT) স্বাক্ষর দেবে ও দেশের পরমাণু সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার (IAEA) সর্বাত্মক পরিদর্শনের মধ্যে রাখবে। কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার পরিপন্থী এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাঁরই মন্ত্রিসভার সহযোগী নেতৃবৃন্দ, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদরা তীব্র বিরোধিতা করেন, যার ফলে দেশাইয়ের সেই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

অতঃপর ১৯৮০ সালে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী পুনরায় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করলে ভারতে পরমাণু চর্চা ও গবেষণায় আবার নতুন করে জোয়ার আসে। মার্কিন পক্ষ থেকে ভারতের এই পুনরুজ্জীবিত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গভীর আশঙ্কা থাকলেও, কৌশলগত কারণেই আশির দশকের শুরুতে ভারতের পরমাণু চর্চার এই অগ্রগতি সাধারণ মানুষের জ্ঞাতার্থে বা সংবাদমাধ্যমে খুব বেশি প্রচার পায়নি; বরং নিভৃতেই ভারত তার পরবর্তী প্রজন্মের দেশীয় চুল্লি ও ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণের পথে এগিয়ে যেতে থাকে।

আমাদের কথা


এই দুর্নিবার সময়েও লেখনী চালিয়ে যাওয়ার মত ধীশক্তি ধরে রেখে মুক্তচিন্তকরা নিরন্তর লিখে চলেছেন। তাঁদের লেখাগুলি সংকলিত করে প্রকাশিত হয়ে চলেছে চেতনার অন্বেষণে পত্রিকা। যা দুই বাংলার পাঠকদের কাছে দ্রুত সমাদৃত হয়। এই পথ চলার একটি ধাপে এসে অন্বেষণ পাবলিশার্স পথ চলা শুরু করেছে মূলত মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্ক বইগুলিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে। আমাদের কথা বলতে লেখক, পাঠক সবাই মিলিয়েই আমরা।

ওয়েবসাইট প্রসঙ্গে


এটি মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ চর্চা এবং বইপত্রের প্ল্যাটফর্ম। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যুক্তিবাদীদের লেখার চর্চাকে অনুপ্ররণা যোগাবে। লগইন করে আপনিও লিখতে পারবেন, ওয়েবসাইটটি সমস্ত বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত।

যোগাযোগ


Email: yuktibadira@gmail.com

WhatsApp: +91-9433794-113


Website visit count:
96049