ভারতের পরমাণু চর্চা (চতুর্থ পর্ব) : আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তির রাজনীতি ও ভারতের সার্বভৌম অবস্থান
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | | views :2 | like:0 | share: 0 | comments :0
বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরমাণু রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিভিন্ন পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি প্রণয়ন এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ওপর তা চাপিয়ে দেওয়ার কূটনৈতিক কৌশল। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি উন্নয়ন এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার অব্যাহত থাকলেও, অন্যদিকে নিজেদের দেশের আত্মরক্ষার তাগিদে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা, সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরমাণু কর্মসূচিকে আইনি বাধায় শৃঙ্খলিত করতে একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তির অবতারণা করে। আংশিক পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (PTBT), পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তি (NPT) এবং সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (CTBT)-কে ঘিরে আবর্তিত এই বৈষম্যমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে ভারতের সার্বভৌম অবস্থান দেশের বিজ্ঞান ও প্রতিরক্ষা ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
৪.১ আংশিক পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (PTBT) এবং ভূ-গর্ভস্থ পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক বিতর্ক
১৯৬৩ সালে মহারাষ্ট্রের তারাপুরে ভারতের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণের কাজ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ভবিষ্যৎ পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সোভিয়েত রাশিয়া, ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের মতো বিশ্বের অন্যান্য পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো একের পর এক পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর ফলে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল প্রবলভাবে তেতে ওঠে। ক্রমবর্ধমান এই পারমাণবিক প্রতিযোগিতা ও পরিবেশগত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এমন একটি আন্তর্জাতিক আইন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যার প্রাথমিক ও ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ রোধ করার মাধ্যমে নতুন করে পরমাণু বোমা তৈরি এড়ানো।
এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় ‘আংশিক পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’ বা পার্শিয়াল টেস্ট ব্যান ট্রিটি (Partial Test Ban Treaty), যা সংক্ষেপে ‘পিটিবিটি’ (PTBT) নামে পরিচিত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রই পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার সার্বিক নিষিদ্ধকরণ চেয়েছিল। কিন্তু পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বার্থে এবং বিশ্ব জনমানসে পরিবেশ রক্ষার সমর্থনের জোয়ারে শেষ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডল বা প্রকাশ্য স্থানের পরিবর্তে কেবল মাটির নিচে পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
মাটির নিচে বা ভূ-গর্ভে পরমাণু বিস্ফোরণের সপক্ষে তৎকালীন প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের একাংশ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মাটির গভীরে বোমা ফাটালে তার থেকে উৎপন্ন মারাত্মক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ (Radioactive radiation) বাইরে বা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে না। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, বিজ্ঞানীদের সেই আশ্বাস সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না এবং মাটির নিচে ঘটানো বিস্ফোরণ থেকেও পরিবেশে বিপজ্জনক মাত্রায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট এই তেজস্ক্রিয় দূষণ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিতর্কের বিষয়ে বিস্তৃত ও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় গ্রেস এম. ফারেরা (Grace M. Ferrara) সম্পাদিত বিখ্যাত সংকলন গ্রন্থ ‘অ্যাটমিক এনার্জি অ্যান্ড দ্য সেফটি কন্ট্রোভার্সি’ (Atomic Energy and the Safety Controversy) পুস্তকে। সর্বোপরি, বায়ুমণ্ডলে পরীক্ষা বন্ধ হলেও মাটির নিচে বিস্ফোরণের পথ খোলা থাকায় এই আংশিক চুক্তির (PTBT) ফলে বিশ্বজুড়ে পরমাণু অস্ত্রের প্রসার বিন্দুমাত্র রোধ করা যায়নি।
৪.২ পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তি (NPT) এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী দ্বন্দ্ব
আংশিক পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর, ১৯৬৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চালু হয় ‘পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তি’ বা নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি (Non-Proliferation Treaty), যা সংক্ষেপে ‘এনপিটি’ (NPT) নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের আমলেও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক অভিযান চালানো হয়। কিন্তু এই চুক্তির কাঠামোটি শুরু থেকেই ছিল চরম বৈষম্যমূলক, কারণ এতে নির্ধারিত গুটিকয়েক পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো দেশের পরমাণু অস্ত্রের অধিকারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এই বৈষম্য ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত, পাকিস্তান এবং চীন (প্রাথমিক পর্যায়ে) এই এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।
১৯৬৮ সালে ভারত কেন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারে না, তার কৌশলগত কারণ ব্যাখ্যা করে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিবের একটি লিখিত বিবৃতি সংসদে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছিল। ওই বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয় যে, ভারত কোনোভাবেই এমন একতরফা পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারে না, কারণ ভারতের ঠিক পাশেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের (চীনের, যারা ১৯৬৪ সালে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল) হাতে ইতিমধ্যেই পরমাণু বোমা মজুত রয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পরমাণু সক্ষমতা এবং ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির এই বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানী ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা তাঁর জীবদ্দশায় প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে বারবার সচেতন করেছিলেন।
তবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক মহলের অন্দরে পরমাণু বোমা তৈরি করা উচিত কি না, তা নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য ও নৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ১৯৬৬ সালে বিজ্ঞানী হোমি ভাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. বিক্রম সারাভাই। ড. সারাভাই ব্যক্তিগত ও নীতিগতভাবে পরমাণু বোমা বানানোর ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং পরমাণু শক্তিকে কেবল উন্নয়নমূলক কাজে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। একইভাবে, পণ্ডিত নেহরুর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীও কখনো সামরিক উদ্দেশ্যে পরমাণু বোমা বানানোর পক্ষে ছিলেন না; তবে তিনি দেশের উন্নয়ন ও গবেষণার স্বার্থে শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য পরমাণু বিস্ফোরণ (Peaceful Nuclear Explosion) ঘটানোর প্রস্তাবে সহমত প্রদান করেছিলেন।
কিন্তু ড. বিক্রম সারাভাইয়ের আপত্তি সত্ত্বেও ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় অধিকর্তারা ও বিজ্ঞানীরা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পরমাণু বোমা বানানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। ১৯৬৬ সালে প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর প্রয়াণের পর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালের ২৮ এপ্রিল লোকসভায় প্রদত্ত এক বিবৃতি থেকে জানা যায় যে, প্রকাশ্য নীতিগত অবস্থানে শ্রীমতী গান্ধীও প্রথমে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বানানোর বিপক্ষে ছিলেন; কিন্তু ভারতের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি বৈষম্যমূলক এনপিটি (NPT) চুক্তি স্বাক্ষরেরও তীব্র বিরোধী ছিলেন।
বস্তুত, পরমাণু চর্চায় রত যেকোনো দেশের মধ্যেই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে পরমাণু বোমা বানানোর একটি স্বাভাবিক প্রবণতা কাজ করে। তাই প্রকাশ্য কূটনৈতিক স্তরে শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের কথা বলা হলেও, কেবলমাত্র উচ্চতর পারমাণবিক পারদর্শিতা অর্জনের জন্য ভারতে গোপনে পারমাণবিক বিজ্ঞানের কৌশলগত চর্চা শুরু হয়। ১৯৬৮ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. রাজাগোপাল চিদম্বরমের নেতৃত্বে পরমাণু বোমা বা বিস্ফোরক তৈরি করার অত্যন্ত গোপন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এই বিশেষ গবেষণাকর্মে প্রায় ৭৫ জন দক্ষ ভারতীয় বিজ্ঞানী নিযুক্ত হন।
পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে পোখরানে ভারতের প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের পর আন্তর্জাতিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে ওয়াশিংটন সফরকালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই এক বিতর্কিত বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে, ভারত পরমাণু প্রসারণ বিরোধী চুক্তিতে (NPT) স্বাক্ষর দেবে এবং ভারতের সমস্ত পরমাণু সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শনের অধীনে রাখবে। কিন্তু মোরারজি দেশাইয়ের এই ব্যক্তিগত নমনীয় মনোভাব দেশের অভ্যন্তরে তীব্র বাধার সম্মুখীন হয় এবং তাঁর সহযোগী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পরমাণু বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রবল বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।
৪.৩ সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (CTBT) এবং ‘সাব-ক্রিটিক্যাল টেস্ট’-এর রাজনীতি
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পিটিবিটি (PTBT) এবং এনপিটি (NPT)—উভয় চুক্তিরই চরম ব্যর্থতা লক্ষ্য করার পর, নব্বইয়ের দশকে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর উদ্যোগে একটি নতুন চুক্তি তৈরি করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১০ জানুয়ারি প্রণীত এই নতুন চুক্তিটির নাম দেওয়া হয় ‘সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’ বা কমপ্রিহেনসিভ টেস্ট ব্যান ট্রিটি (Comprehensive Test Ban Treaty - CTBT)। কাগজে-কলমে এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হিসেবে সার্বিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ এবং বিশ্বজুড়ে যেকোনো ধরনের পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ চিরতরে রোধ করার প্রচেষ্টার কথা প্রচার করা হয়।
কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিটিবিটি চুক্তির আসল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের যে সমস্ত রাষ্ট্র তখনো পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী নয়, তাদের নতুন করে অস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। কারণ, প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই চুক্তির নিষেধাজ্ঞাগুলো আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো উন্নত পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর ক্ষেত্রে কার্যত প্রযোজ্য বা বাধাস্বরূপ ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটানোর পর থেকে শুরু করে পরবর্তী দশকগুলোতে বহুবার বাস্তব পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিপুল তথ্যভাণ্ডার সংগ্রহ করে রেখেছিল। নব্বইয়ের দশকে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে প্রভূত উন্নয়ন হওয়ার ফলে এই উন্নত দেশগুলোর হাতে আসে কম্পিউটার সিমুলেশন পদ্ধতিতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরীক্ষা করার অত্যাধুনিক সুযোগ।
মাটির নিচে বা বায়ুমণ্ডলে কোনো প্রকৃত চেইন রিঅ্যাকশন বা পূর্ণাঙ্গ বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে গবেষণাগারে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে পরিচালিত এই পরীক্ষাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলা হয় ‘সাব-ক্রিটিক্যাল টেস্ট’ (Sub-critical test)। সিটিবিটি চুক্তিতে প্রচলিত বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করা হলেও উন্নত দেশগুলোর এই ‘সাব-ক্রিটিক্যাল টেস্ট’ নিষিদ্ধ করা হয়নি, ফলে তারা চুক্তির মধ্যে থেকেও নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকীকরণ করতে পারত। উপরন্তু, সিটিবিটি চুক্তির বিধানে এমন কঠোর শর্ত রাখা হয়েছিল যে, যে সমস্ত দেশ এই চুক্তি অনুমোদন করবে না, তাদের ওপর আন্তর্জাতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার মহৎ উদ্দেশ্যের কথা বলে এই চুক্তি করা হলেও, যারা গোড়া থেকেই বিপুল পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী বা পরমাণু শক্তিধর, তাদের অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করা বা তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো অনুরূপ কথা এই চুক্তিতে বলা ছিল না।
৪.৪ পরমাণু বৈষম্য ও নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নে ভারতের সার্বভৌম অবস্থান
এনপিটি এবং সিটিবিটি—উভয় চুক্তিতেই স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ভারতের ওপর ধারাবাহিকভাবে প্রবল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পর যে সমস্ত দেশ এনপিটি-তে স্বাক্ষর করেনি, তাদের বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ না দেওয়ার প্রস্তাব তোলা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ভারত। আবার আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী ভারত এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) নির্দিষ্ট নীতি-নির্ধারণী স্তরে কোনো ভারতীয় সদস্য দীর্ঘকাল স্থান পাননি। এমনকি ২০০৫ সালে ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির সময়ও ভারত এনপিটি-তে স্বাক্ষর না করায় ব্রিটেন ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ীও চার-পাঁচটি স্বীকৃত রাষ্ট্র (নিউক্লিয়ার ক্লাব) ছাড়া পারমাণবিক শক্তির সামগ্রিক ব্যবহার (সামরিক ও অসামরিক) অন্য কেউ করতে পারবে না, এবং এনপিটি-বহির্ভূত দেশ হওয়ায় ভারত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হয়েও আন্তর্জাতিক স্তরে সহজে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবে না বলে বারবার চাপ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এই সমস্ত আন্তর্জাতিক রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞার ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে ভারত তার সার্বভৌম অবস্থানে অবিচল থেকেছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক মহল থেকে যতই চাপ আসুক না কেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে ভারত এই বৈষম্যমূলক চুক্তিতে (NPT/CTBT) কখনোই স্বাক্ষর করবে না। অন্যদিকে ভারতের দায়িত্বশীল পরমাণু নীতির কথা স্পষ্ট করে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. এপিজে আব্দুল কালাম (১৯৯৮-এর দ্বিতীয় পোখরান পরীক্ষার পর) বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন যে, ভারত স্বেচ্ছায় আর নতুন কোনো পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাবে না (Voluntary moratorium) এবং ভারত কখনোই কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের প্রথম প্রয়োগ (No First Use) করবে না।
পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নে ভারতের রাষ্ট্রীয় অবস্থান অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও সুস্পষ্ট। ভারতের দাবি হলো, নিজেদের হাতে থাকা নিজস্ব ও দেশীয় পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র তৈরি করে মজুত করতে ভারতের কোনো আপত্তি নেই এবং এতে কারো হস্তক্ষেপ ভারত মানবে না। ভারত স্পষ্টভাবে শর্ত দিয়েছে যে, বিশ্বের বর্তমান পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি বৈষম্য ত্যাগ করে তাদের ভাণ্ডারে সঞ্চিত সমস্ত পরমাণু বোমা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করে, তবেই কেবল ভারত পরমাণু প্রসারণ বিরোধী চুক্তি (NPT) এবং সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে (CTBT) স্বাক্ষর প্রদান করবে।