ভারতের পরমাণু চর্চা (তৃতীয় পর্ব ) : পরমাণু কূটনীতি, ‘অ্যাটমস ফর পিস’ এবং ভারতের প্রাথমিক চুল্লি নির্মাণ (১৯৫৩–১৯৬৩)

Tushar Gorai


Nov. 1, 2026 | | views :2 | like:0 | share: 0 | comments :0

ভারতের অভ্যন্তরে পরমাণু গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপনের সমান্তরালে পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক পরমাণু কূটনীতির জটিল আবর্তে ভারতকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। ভারত প্রাথমিকভাবে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকলেও, ঠান্ডা যুদ্ধের মেরুকরণের কারণে ভারতীয় রাষ্ট্রনেতা এবং বিজ্ঞানীরা অচিরেই আন্তর্জাতিক বিবাদের সম্মুখীন হন। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা এবং অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনকে নিয়ে গঠিত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’ বিশ্বের পারমাণবিক সম্পদ ও প্রযুক্তির ওপর নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিল। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত সময়কালটি ছিল এই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বৈদেশিক সহযোগিতা ও দেশীয় দক্ষতার সমন্বয়ে দেশের প্রথম পর্যায়ের পারমাণবিক চুল্লিগুলো নির্মাণের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

৩.১ থোরিয়াম বিতর্ক, মার্কিন চাপ এবং ভারতের সার্বভৌম অবস্থান (১৯৫৩)

১৯৫৩ সালে ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীন ও সার্বভৌম উদ্যোগকে প্রথম থেকেই আমেরিকা বাধা দিতে শুরু করে। এই কূটনৈতিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে ১৯৫৩ সালে ভারত থেকে চীনে ২ টন থোরিয়াম নাইট্রেট পাঠানোকে কেন্দ্র করে। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন পরমাণু শক্তির প্রসার রোধ ও কমিউনিস্ট ব্লককে কোণঠাসা করার লক্ষ্যে একটি কঠোর পারমাণবিক আইন প্রণয়ন করেছিল, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে সম্পর্কিত বা তাদের মিত্র কোনো দেশের সাথে পারমাণবিক যেকোনো লেনদেন করলে সংশ্লিষ্ট দেশকে আমেরিকা কোনো আর্থিক এবং সামরিক সহায়তা প্রদান করবে না। এই আইনের দোহাই দিয়ে ভারত থেকে চীনে থোরিয়াম নাইট্রেট পাঠানোর অপরাধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে আর্থিক সহায়তা না করার কড়া বার্তা দেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা হুমকির বিরুদ্ধে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন যে, ভারত তার সার্বভৌম অধিকার কখনোই ক্ষুণ্ণ হতে দেবে না। পণ্ডিত নেহরু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দেন যে, মার্কিন রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী ভারত পরিচালিত হয় না এবং বৈদেশিক আর্থিক সহায়তা পাওয়ার বিনিময়ে ভারত কখনোই তার নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্রীয় নীতি বিসর্জন দেবে না। সদ্য স্বাধীন একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই অনড় এবং কঠোর মানসিকতা সেদিন মার্কিন প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল।

ভারতের এই আপসহীন অবস্থানের মুখে কৌশল পরিবর্তন করে আমেরিকা ভারতের সমস্ত থোরিয়াম কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু থোরিয়াম নাইট্রেটের সেই ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় স্থান নিলেও, ভারতের এই স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে আমেরিকা পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধতায় কাজে লাগাতে উদ্যত হয়। তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়—একদিকে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহার করার মার্কিন বাসনা প্রবল ছিল এবং চীনের বিরোধিতায় ভারতকে নামানোর জন্য আমেরিকা ক্ষেত্রবিশেষে তার পারমাণবিক আইন শিথিল করতেও রাজি ছিল; আবার অন্যদিকে ভারতকে চাপে রাখতে পারমাণবিক চর্চা ও সামরিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে সাহায্য করতেও আমেরিকা প্রস্তুত হয়ে ওঠে।

এই টানাপোড়েন চলাকালীনই ১৯৫৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব জন ফস্টার ডালেস পাকিস্তান পরিভ্রমণে আসেন। ভারত থেকে চীনে থোরিয়াম সরবরাহের ব্যাপারে ডালেসের তীব্র আপত্তি ছিল। পাকিস্তান সফরকালে ডালেস ওয়াশিংটনে বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে, এশিয়ায় কমিউনিজম প্রতিরোধে পাকিস্তান নৈতিক শক্তিতে ভরপুর এক রাষ্ট্র। দেশে ফিরে তিনি এমনও মন্তব্য করেছিলেন যে, পাকিস্তান সামরিকতায় ও আধ্যাত্মিকতায় অতি উন্নত রাষ্ট্র; অথচ ভারতের জোটনিরপেক্ষ ও স্বাধীন নীতির কারণে তিনি পণ্ডিত নেহরুকে একজন অত্যন্ত অবাস্তববাদী রাজনীতিজ্ঞ বলে অভিহিত করেছিলেন।

আমেরিকার এই দ্বিমুখী নীতির মূলে ছিল চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে তাদের গভীর আতঙ্ক। চীনে পরমাণু বোমা নির্মাণ ও মজুতের আশঙ্কায় আমেরিকা যথেষ্ট শঙ্কিত ছিল; আবার মার্কিন পরমাণু বোমার ধ্বংসাত্মক শিল্পের অগ্রগতির ভয়াবহতা সামনে রেখেই চীনও আত্মরক্ষার তাগিদে পরমাণু শক্তি চর্চায় ব্রতী হয়েছিল। চীন ও সোভিয়েত রাশিয়ার তৎকালীন সম্মিলিত সামরিক শক্তি মার্কিন প্রশাসনের কাছে ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। চীন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় পারমাণবিক শক্তির জগতে অনেকখানি উন্নতি সাধন করেছিল এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও কৃষি সার তৈরির মতো শান্তিপূর্ণ কাজেও তারা যথেষ্ট পরিমাণে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার শুরু করেছিল। আমেরিকা একদিকে চীনের পরমাণু বোমা তৈরির উদ্যোগকে প্রবল সমালোচনার মুখে ফেলে, অন্যদিকে এশিয়া মহাদেশে ভারতকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খাড়া করার উদ্দেশ্যে ভারতের পারমাণবিক চর্চাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার চেষ্টা চালায়। ভারত যখন শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তির বিকাশে ইচ্ছা প্রকাশ করে, তখন সোভিয়েত রাশিয়া এবং আমেরিকা উভয়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল; কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল ভারত যেন পারমাণবিক শক্তির ব্যাপারে কোনোভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঢলে না পড়ে।

৩.২ ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) গঠন

ভারত ও চীনের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাধীন পরমাণু চর্চায় কেবল দ্বিপাক্ষিক চাপ সৃষ্টি করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষান্ত হয়নি, বরং বিশ্বের যাবতীয় পরমাণু সম্পদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বৈশ্বিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়। এই লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার ‘শান্তির জন্য পরমাণু চর্চা’ (Atoms for Peace) শীর্ষক এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং একটি আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা গঠনের সুপারিশ করেন। আইজেনহাওয়ারের প্রস্তাবের মূল কথা ছিল, বিশ্বের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের সম্পূর্ণ দায়ভার এই আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর ন্যস্ত করা হবে। এর পেছনে আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকা, যাতে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর গুটিকয়েক সদস্য রাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনো দেশ পরমাণু বোমা তৈরি করার সুযোগ না পায়।

প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের এই একাধিপত্যবাদী প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু লোকসভায় দাঁড়িয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। নেহরু অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সংসদকে জানান যে, আন্তর্জাতিক সংস্থার আড়ালে বিশ্বের সমস্ত পারমাণবিক সম্পদের ওপর কেবলমাত্র একটি বিশেষ দেশের আধিপত্য তৈরি করার চেষ্টা চলছে। তিনি আরও ইঙ্গিত করেন যে, মার্কিন সাম্রাজ্যের এই কৌশলের মূল লক্ষ্যবস্তু হলো চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং এশিয়া-আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিজ্ঞানচর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করা। উল্লেখ্য, সেই সময় সমাজতান্ত্রিক চীন রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্যপদ পায়নি এবং তাইওয়ানই সমগ্র চীনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রসঙ্ঘে প্রতিনিধিত্ব করত।

পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা তৈরির রূপরেখা নির্ধারণের জন্য রাষ্ট্রসঙ্ঘে যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়, তাতে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বর্ষীয়ান কূটনীতিবিদ ভি. কে. কৃষ্ণ মেনন। কৃষ্ণ মেনন নীতিগতভাবে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা তৈরির পক্ষে সায় দিলেও ভারতের কৌশলগত স্বার্থরক্ষায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উত্থাপন করেন। তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, এই সংস্থার নিয়মাবলীর কারণে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর শান্তিপূর্ণ পরমাণু চর্চার পথে যেন কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি না হয়।

শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণ মেননের এই সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং গঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি’ (IAEA) বা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা। এই সংস্থার বিধিব্যবস্থা অনুযায়ী নির্ধারিত হয় যে, বিশ্বের কোনো দেশকে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করার আগে রপ্তানিকারক দেশকে বাধ্যতামূলকভাবে এই সংস্থার অনুমতি নিতে হবে। যদিও উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তবুও বাস্তবে এই সংস্থার ওপর মার্কিন কূটনীতি ও আধিপত্য যথেষ্ট পরিমাণে বজায় থাকে, যার প্রমাণ মেলে বহু দশক পরে ২০০৫ সালের ১৮ জুলাই স্বাক্ষরিত ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির সময়ও, যেখানে আমেরিকা থেকে জ্বালানি পাওয়ার জন্য এই সংস্থার অনুমোদন ও পরিদর্শনের শর্তকে প্রধান হাতিয়ার করা হয়েছিল।

৩.৩ ভারতের প্রাথমিক গবেষণা ও বিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণ (অপ্সরা, সাইরাস ও রাওয়াতভাটা)

রাষ্ট্রসঙ্ঘে যখন আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা গঠন নিয়ে গোটা বিশ্বজুড়ে তুমুল কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, ঠিক সেই সময়েই ভারতে প্রয়োজনীয় পারমাণবিক চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর নির্মাণের জন্য ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা জোরকদমে তোড়জোড় শুরু করেছিলেন। ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানীরা ইউরেনিয়াম এবং দেশের অভ্যন্তরে থাকা বিপুল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ড. ভাবা জানতেন যে, চুল্লি নির্মাণ ও পরিচালনার মতো কারিগরি দক্ষতা ভারতে আগে থেকেই রয়েছে; কেবল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মার্কিন বিরোধিতা কৌশলে এড়িয়ে প্রাথমিক পরিকাঠামোটি দাঁড় করানো প্রয়োজন।

এই পর্যায়ে ভারত অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বৈদেশিক কূটনৈতিক সমীকরণকে নিজেদের বিজ্ঞানচর্চার কাজে লাগায়। চীনকে ভারত থেকে থোরিয়াম পাঠানোর ব্যাপারে আমেরিকা নারাজ হলেও, চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে কাজে লাগানোর জন্য মার্কিন প্রশাসন ভারতকে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ছিল। একই সময়ে কানাডার বিশেষজ্ঞরাও ভারতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন।

এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ভারতীয় বিজ্ঞানীদের নিজস্ব প্রচেষ্টার মেলবন্ধনে মুম্বাইয়ের ট্রম্বেতে গবেষণার জন্য পরপর দুটি ছোট মাপের গবেষণা চুল্লি (Research Reactor) নির্মিত হয়। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের প্রথম গবেষণা চুল্লি ‘অপ্সরা’ (Apsara) এবং ১৯৬০ সালে মূলত কানাডার সহযোগিতায় তৈরি হয়ে যায় দ্বিতীয় গবেষণা চুল্লি ‘সাইরাস’ (CIRUS)। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রথম পারমাণবিক চুল্লিটি মার্কিন সংস্থা জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির (General Electric Company) সাহায্যে মহারাষ্ট্রের তারাপুরে এবং দ্বিতীয় বিদ্যুৎ চুল্লিটি কানাডার সহায়তায় রাজস্থানের রাওয়াতভাটায় গড়ে ওঠে।

ভারতে মার্কিন ও পাশ্চাত্য সাহায্যে পরমাণু শক্তির চর্চা গড়ে উঠলেও, ভারতের এই কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিয়ে মার্কিন প্রশাসন প্রথম থেকেই যথেষ্ট সন্দিগ্ধ ছিল। ভারতের পরমাণু চুল্লিগুলোর ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারি চাপিয়ে দেওয়ার মার্কিন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার (IAEA) সভায় ড. হোমি ভাবা এক ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন, যেখানে তিনি ভারতের নিজস্ব পারমাণবিক ব্যবস্থাগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার সপক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন। উল্লেখ্য যে, ড. ভাবার এই প্রারম্ভিক পর্বের পর ভারতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য আর কোনো বৈদেশিক কারিগরি সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি; কারণ অপ্সরা, সাইরাস বা রাওয়াতভাটার মতো প্রাথমিক প্রকল্পগুলোর মাধ্যমেই ভারতীয় কারিগর এবং বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে চুল্লি নির্মাণের যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করে নিয়েছিলেন।

৩.৪ চীন-ভারত যুদ্ধ (১৯৬২) এবং তারাপুর পারমাণবিক চুক্তির রাজনীতি (১৯৬৩)

পঞ্চাশের দশকের শেষভাগ এবং ষাটের দশকের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। কমিউনিস্ট চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে আমেরিকার কাছে ভারতকে পাশে রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে; কিন্তু অন্যদিকে আমেরিকা পাকিস্তানকেও সমান্তরালভাবে বিপুল সামরিক সহায়তা প্রদান করছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ‘এনএসসি ৫৭০১’ (NSC 5701) শীর্ষক একটি গোপন দলিলে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা নিজেরাই স্বীকার করেছিলেন যে, এই সময় ভারত এবং পাকিস্তান—উভয় দেশকে একসাথে তুষ্ট রাখা আমেরিকার পক্ষে অসম্ভব। পারমাণবিক শক্তি প্রসারণ বিরোধী চুক্তি সংক্রান্ত মার্কিন কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে প্রকাশিত এই নথিতে দেখা যায়, আমেরিকার মূল সমস্যা ছিল চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে নিজেদের শিবিরে পাওয়া নিয়ে, বিশেষ করে যখন ভারত তার পারমাণবিক শক্তি বিকশিত করার জন্য আমেরিকার কাছে সাহায্য প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে এক পা বাড়িয়েছিল।

কিন্তু ইতিমধ্যে একটি আন্তর্জাতিক ঘটনায় ভারত-মার্কিন সম্পর্কে সাময়িক শৈত্য দেখা দেয়। পাকিস্তানের ঘাঁটি থেকে ওড়ানো একটি মার্কিন গোয়েন্দা বিমান (U-2) গোপনে সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমানা অতিক্রম করলে সোভিয়েত বাহিনী দূরপাল্লার মিসাইল ছুড়ে বিমানটিকে মাটিতে নামিয়ে আনে এবং মার্কিন পাইলট ধরা পড়ে। এই ঘটনাটি নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘে যখন তুমুল আলোচনা শুরু হয়, তখন ভারত নীতিগতভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ অবলম্বন করে। ভারতের এই অবস্থানের ফলে মার্কিন পক্ষ খানিকটা দমে যায়। তবুও আমেরিকার কৌশলগত ধারণা ছিল এই যে, কমিউনিস্ট চীনের বিরুদ্ধে এশিয়ার দেশগুলোকে ব্যবহার করতে গেলে ভারতকে পাশে পেতেই হবে—ঠিক যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমারেখার মধ্যে মার্কিন গোয়েন্দা বিমান ওড়ানোর সুযোগ দিয়ে পাকিস্তান আমেরিকাকে সাহায্য করেছিল।

বিশেষজ্ঞ জর্জ পারকোভিচের (George Perkovich) লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইন্ডিয়াজ নিউক্লিয়ার বম্ব’ (India's Nuclear Bomb)-এ ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভসের ভারত সম্পর্কিত ১৯৬১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের একটি মার্কিন দলিলের উল্লেখ পাওয়া যায়। ওই দলিলের সাক্ষ্য অনুযায়ী, চীন পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের প্রস্তুতি নেওয়ায় আমেরিকার একাংশ চেয়েছিল চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভারত যেন এশিয়ায় অতিসত্বর প্রথম পরমাণু বিস্ফোরণটি ঘটায়। তবে ওই মার্কিন দলিলে দুটি বড় অসুবিধার কথাও ব্যক্ত করা হয়েছিল: প্রথমত, পরমাণু বোমা বা বিস্ফোরণের ব্যাপারে শান্তিবাদী পণ্ডিত নেহরুর কাছ থেকে সম্মতি নাও পাওয়া যেতে পারে; এবং দ্বিতীয়ত, ভারতকে এ কাজে মদত দিলে তার প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত রাশিয়ার মদতে চীনের পারমাণবিক চর্চা আরও দ্রুততর হয়ে উঠবে। এই দোলাচলের কারণে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব ডিন রাস্ক (Dean Rusk) সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র রাজনীতির ব্যাপারে ভারতকে শেষ পর্যন্ত জড়াতে চাইছিলেন না এবং ভারতের তারাপুরে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের সহযোগিতার বিষয়টি নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের অন্দরে তীব্র টানাপোড়েন চলছিল।

১৯৬২ সালে তারাপুর চুল্লি নিয়ে মার্কিন সহায়তায় এই ঢিলেমি দেখা দিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য সাহায্য পাওয়ার একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু ভারত সেই মুহূর্তে সোভিয়েত পথে অগ্রসর হয়নি। ইতিমধ্যে ১৯৬২ সালেই সংঘটিত হয় চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধ। রাশিয়ার গোয়েন্দা অন্তর্জালের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া বিভিন্ন তথ্য থেকে চীনের বুঝতে বাকি রইল না যে এই সংঘাতের পেছনে আমেরিকারও অভিসন্ধি রয়েছে। ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যাটি অত্যন্ত জরুরি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলে এবং সেই সীমান্ত সমস্যা আজও বর্তমান রয়ে গেছে।

১৯৬২ সালের এই চীন-ভারত যুদ্ধের ফলে ভারতের প্রতি আমেরিকার প্রত্যক্ষ সহানুভূতি হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে যায়। এই ভূ-রাজনৈতিক সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা ১৯৬৩ সালে মহারাষ্ট্রের তারাপুরে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের সহায়তার জন্য এগিয়ে আসে এবং চুল্লির জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানির জোগান দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সাহায্যের বিনিময়ে একটি কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেয় যে, তারাপুরের এই পারমাণবিক চুল্লি ও গবেষণা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও পরিদর্শনের অধীনে থাকবে।

বিজ্ঞানী ড. হোমি ভাবা এই আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের শর্তের তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ তখন বিশ্বের অন্য কোথাও এই সংস্থার এহেন পরিদর্শনের ব্যবস্থা চালু ছিল না। কিন্তু চীন-ভারত যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপে ভারতের পক্ষে ড. ভাবার সেই আপত্তি শেষ পর্যন্ত টেকেনি এবং ভারতকে ওই শর্ত মেনে নিতে হয়।

তারাপুর চুক্তির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকটিও ছিল ভারতের স্বনির্ভরতার পরিপন্থী। মার্কিন প্রযুক্তিবিদরা তারাপুরে যে হালকা জলের পারমাণবিক চুল্লি (Boiling Water Reactor) নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন, তার নকশা এমন ছিল যে তাতে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (Enriched Uranium) জ্বালানিই ব্যবহৃত হতে পারত। অথচ ভারতের নিজস্ব খনিজ সম্পদ ভাণ্ডার থেকে যে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম সংগৃহীত হয়, তা থেকে বিশেষ খরচ ও জটিল প্রযুক্তিসাপেক্ষ পাঁচটি রাসায়নিক কম্পাউন্ডের প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম-২৩৩ বা দেশীয় জ্বালানি বের করে আনা সম্ভব হলেও তারাপুরের মার্কিন চুল্লিতে তা সরাসরি ব্যবহারের উপায় ছিল না। সমালোচকদের মতে, তারাপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভারত তার নিজস্ব পারমাণবিক স্বনির্ভরতার নীতি বজায় রাখতে পারেনি এবং অজস্র বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করে মার্কিন চুল্লি কেনার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

তারাপুরের এই দুটি চুল্লি নির্মাণের জন্য মার্কিনিদের কাছে ভারতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮০ লক্ষ ডলার, যা দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে পরিশোধযোগ্য ছিল। এই বিপুল ঋণের বোঝার পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে চুল্লি সচল রাখার জন্য একচেটিয়াভাবে আমেরিকার কাছ থেকেই পারমাণবিক জ্বালানি ক্রয় করতে হতো। মার্কিন জ্বালানির ওপর এই নির্ভরশীলতাকে যে আমেরিকা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তার চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে ১৯৭৪ সালে—যখন পোখরানে ভারতের প্রথম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমেরিকা একতরফাভাবে তারাপুর চুল্লির জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে দেয়।

আমাদের কথা


এই দুর্নিবার সময়েও লেখনী চালিয়ে যাওয়ার মত ধীশক্তি ধরে রেখে মুক্তচিন্তকরা নিরন্তর লিখে চলেছেন। তাঁদের লেখাগুলি সংকলিত করে প্রকাশিত হয়ে চলেছে চেতনার অন্বেষণে পত্রিকা। যা দুই বাংলার পাঠকদের কাছে দ্রুত সমাদৃত হয়। এই পথ চলার একটি ধাপে এসে অন্বেষণ পাবলিশার্স পথ চলা শুরু করেছে মূলত মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্ক বইগুলিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে। আমাদের কথা বলতে লেখক, পাঠক সবাই মিলিয়েই আমরা।

ওয়েবসাইট প্রসঙ্গে


এটি মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ চর্চা এবং বইপত্রের প্ল্যাটফর্ম। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যুক্তিবাদীদের লেখার চর্চাকে অনুপ্ররণা যোগাবে। লগইন করে আপনিও লিখতে পারবেন, ওয়েবসাইটটি সমস্ত বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত।

যোগাযোগ


Email: yuktibadira@gmail.com

WhatsApp: +91-9433794-113


Website visit count:
96049