প্রসঙ্গ: এনআরসি, এনপিআর, সিএএ
সব্যসাচী মুখার্জি
Nov. 19, 2024 | | views :78 | like:0 | share: 0 | comments :0
(প্রথম পর্ব)
ভূমিকা
এনআরসি, এনপিআর, সিএএ- এই শব্দগুলি সম্ভবত বর্তমান ভারতবর্ষে সবথেকে বেশিবার উচ্চারিত শব্দ। আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি অর্থাৎ এনআরসি তালিকা থেকে ঊনিশ লক্ষেরও বেশি মানুষের নাম বাদ যাওয়ার পরে মানুষের মনে এনআরসি তথা নাগরিকত্ব হরণ নিয়ে প্রবল আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে গত এগারোই ডিসেম্বর সংসদে পাশ হয়ে যায় সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০১৯. এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। ছাত্র, যুব, মহিলাদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ ভারতবর্ষের সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসে বিরল। এই বিক্ষোভ আন্দোলনের মাঝেই কেন্দ্রীয় সরকার এনপিআর তৈরির ছাড়পত্র দেয়। ফলে শুরু হয় আরেকদফা বিতর্ক। বারবার অভিযোগ উঠতে থাকে যে এই এনপিআর-ই হলো এনআরসি-র প্রথম ধাপ। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্টমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন ভোটার কার্ডও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। ফলে মানুষেরই মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়তে থাকে। সঙ্গে ছড়াতে থাকে গুজব, ভুল তথ্য। সে কারণেই চেষ্টা করছি আপনাদের সামনে সরকারি নথিপত্র সহ সঠিক তথ্য তুলে ধরতে। তারপর ভালো মন্দ বিচারের সিদ্ধান্ত আপনাদের।
পর্ব এক: এনপিআর এবং এনআরসি
এনপিআর, এনআরসি এবং ভারতীয় নাগরিকত্ব সম্বন্ধে জানতে গেলে সময়রেখা ধরে একটু পিছনের দিকে যাওয়া দরকার। স্বাধীন ভারতের সংসদে ১৯৫৫ সালে সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট পাশ হয়। এই আইন বলেই ভারতের মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় নাগরিকত্বের বিষয়ে সমস্ত তথ্য এই আইনে রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী পাঁচভাবে ভারতের নাগরিক হওয়া যেতে পারে। বাই বার্থ অর্থাৎ জন্মগত ভাবে, বাই ডিসেন্ট অর্থাৎ বাবা মা ভারতবর্ষের নাগরিক হলে, বাই রেজিস্ট্রেশন অর্থাৎ আবেদনের ভিত্তিতে, বাই ন্যাচারালাইজেশন অর্থাৎ স্বাভাবীকরণের ভিত্তিতে এবং বাই ইনকোরপোরেশন অফ টেরিটরি অর্থাৎ কোনও এলাকা যেটা দেশের সীমানার মধ্যে আগে ছিলো না; পরে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে- সেই এলাকার প্রত্যেকে ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবে(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://indiacode.nic.in/bitstream/123456789/4210/1/Citizenship_Act_1955.pdf&ved=2ahUKEwivis37zJnoAhXAyDgGHbHRB9oQFjAYegQIBBAB&usg=AOvVaw0FzIFeLkTmCmbDkBnlGGVC&cshid=1584177656758 )। স্বাধীন ভারতের আইন অনুযায়ী ভারতের মাটিতে জন্মানো সব শিশুরা ভারতের নাগরিকত্ব পেতো। যে কোনও আধুনিক, সভ্য রাষ্ট্রে সেটাই হওয়া উচিৎ। ১৯৫৫ সালের এই নাগরিকত্ব আইন বেশ কয়েকবার সংশোধিত হয়েছে। ধীরে ধীরে বারবার সংশোধনী এনে নাগরিকত্ব পাওয়ার রাস্তাকে সংকুচিত করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালে সংশোধনী এনে বলা হয় ভারতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই অবধি। কিন্তু সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয় ২০০৩ সালে; যখন কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বে এনডিএ-র সরকার(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=http://164.100.47.4/billstexts/rsbilltexts/AsIntroduced/XXXIX_2003.pdf&ved=2ahUKEwiUs4j20ZnoAhWHzjgGHbNjDR8QFjASegQIAxAB&usg=AOvVaw2B_mzG4kTdFndT0AfduIfh)। ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে(চিত্র: ১, চিত্র: ৩৮)। একইসঙ্গে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়েও বিস্তর পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী এই দেশে জন্মালেই একটি শিশু সঙ্গে সঙ্গে ভারতের নাগরিক হয়ে যেতো; শিশুর বাবা মায়ের নাগরিকত্বের সঙ্গে শিশুটির নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক ছিলো না। এই সংশোধনীতে বলা হয়- ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের পর থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০০৩ লাগু হওয়ার তারিখ(অর্থাৎ ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বর) পর্যন্ত জন্ম হলে প্রমাণ করতে হবে যে বাবা অথবা মায়ের মধ্যে কেউ একজন ভারতীয় নাগরিক। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০০৩ লাগু হওয়ার পর জন্মালে প্রমাণ করতে হবে যে বাবা অথবা মায়ের কেউ একজন ভারতীয় নাগরিক এবং অন্যজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নন(চিত্র:২)। একইসঙ্গে এই সংশোধনী ১৯৫৫ সালের সিটিজেনশিপ অ্যাক্টে ১৪এ ধারা যুক্ত করে যা সরকারকে গোটা দেশে এনআরআইসি করবার ক্ষমতা দেয়(চিত্র: ৩)। ১৪এ ধারায় লেখা আছে কেন্দ্র সরকার ভারতের প্রত্যেক নাগরিককে বাধ্যতামূলক ভাবে পঞ্জিকরণ করতে পারে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করতে পারে। এই এনআরআইসি হলো ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেনস। আসামে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এনআরসি অর্থাৎ ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস তৈরি হয়েছে। দেশব্যাপী নাগরিকপঞ্জি অর্থাৎ এনআরসি হলে তাকেই এনআরআইসি বলা হয়। দুটোর মধ্যে কোনও মূলগত তফাৎ নেই।
২০০৩ সালের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন সংসদে সর্বসম্মতিতে পাশ হয়। এই আইনে এনআরসি তৈরির বিষয়টিই কেবল আপত্তিজনক নয়; শিশুর নাগরিকত্বকে তার বাবা মায়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়াও অত্যন্ত আপত্তিজনক। যারা অনাথ আশ্রমে বড়ো হয়েছে বা যে সমস্ত মানুষরা "সিঙ্গেল পেরেন্ট"; তাঁদের সন্তানদের নাগরিকত্ব ভয়াবহ বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। সর্বোপরি ১৯৮৭ সালের পয়লা জুলাই থেকে ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ হওয়া পর্যন্ত যারা জন্মেছিলো; তারা জন্মেই নাগরিক হয়ে গেছিলো। এই আইন পাশ করিয়ে পুনরায় তাদের নাগরিকত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হলো।
দেশের সংসদে যখন কোনও আইন তৈরি হয়; সেই আইন কীভাবে কার্যকর করা হবে সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক একটি নিয়ম বা রুলস তৈরি করে। ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ হওয়ার পরেও এরকম একটি রুল তৈরি হয়; যার নাম- সিটিজেনশিপ (রেজিস্ট্রেশন অফ সিটিজেনস অ্যান্ড ইস্যু অফ ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড) রুলস-২০০৩. এই রুলসেই এনআরআইসি এবং এনপিআর তৈরির বিষয়ে লেখা আছে
(তথ্যসূত্র: https://drive.google.com/file/d/1GRr0YEJ5Ouj03GKJR5ZOR4ie9XoojHTq/view?usp=drivesdk)। ৩১ জুলাই, ২০১৯ এ কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এনপিআরের গেজেট নোটিফিকেশন জারি করা হয়। সেই নোটিফিকেশনে লেখা রয়েছে সিটিজেনশিপ (রেজিস্ট্রেশন অফ সিটিজেনস অ্যান্ড ইস্যু অফ ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড) রুলস-২০০৩ এর রুল নম্বর ৩ এর সাব রুল ৪ অনুযায়ী সরকার এনপিআর করতে চাইছে(চিত্র: ৪)। কী লেখা আছে সিটিজেনশিপ (রেজিস্ট্রেশন অফ সিটিজেনস অ্যান্ড ইস্যু অফ ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড) রুলস-২০০৩ এর রুল নম্বর ৩ এর সাব রুল ৪ এ? ৩ নম্বর রুল হলো "ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেনস"; অর্থাৎ এনআরসি তৈরির রুল(চিত্র:৫)। সেই এনআরআইসি তৈরির রুলের ৪ নম্বর সাব রুলে লেখা রয়েছে- কেন্দ্রীয় সরকার এই বিষয়ে নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে; তার মধ্যে লোকাল রেজিস্টারের জুরিসডিকশনে বসবাসকারী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করে পপুলেশন রেজিস্টার তৈরি করতে পারে(চিত্র:৬)। ৫ নম্বর সাবরুলে লেখা আছে পপুলেশন রেজিস্টারের প্রত্যেক ব্যক্তির তথ্য যাচাই করে লোকাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেনস তৈরি হবে(চিত্র:৭)।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; এনপিআরের গেজেট নোটিফিকেশনে বলা আছে যে আসামে এনপিআর হবে না। কেন? তার কারণ আসামে এনআরসি হয়ে গেছে। এনআরসি হয়ে গেলে আইনত আর এনপিআর করা যায় না।
সিটিজেনশিপ রুলস ২০০৩ এর ৪ নম্বর রুলের ৩ এবং ৪ নম্বর সাবরুলে লেখা আছে- পপুলেশন রেজিস্টারের প্রত্যেক ব্যক্তির তথ্য লোকাল রেজিস্টার দ্বারা যাচাই করা হবে এবং যাচাই প্রক্রিয়ায় সময়ে যাদের নাগরিকত্ব সন্দেহজনক মনে হবে; লোকাল রেজিস্টার সেই বিষয়টা পপুলেশন রেজিস্টারে উল্লেখ করবেন। সেই বিষয়ে তদন্ত হবে এবং উক্ত ব্যক্তিকে সেটা জানানো হবে(চিত্র:৮)। এবারের এনপিআরে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে আধার নম্বর এবং বাবা মায়ের তথ্য। বাবা, মা কবে কোথায় জন্মেছেন; সেটাও জানাতে হবে; যা অনেকেই জানেন না। ফলে তাঁরা উত্তর দিতে পারবেন না। মুশকিল হলো; সিটিজেনশিপ রুলস-২০০৩ এ কোথাও বলা নেই ঠিক কী কী তথ্য না দিলে সরকারি আধিকারিক কাউকে সন্দেহজনক নাগরিক ঘোষণা করতে পারেন। সবটাই সরকারি আধিকারিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সর্বোপরি; আধার নম্বর বাধ্যতামূলক করা অন্য একটি বিষয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। আধার কার্ডের ওপর বড়ো করে লেখা আছে। এনপিআর হয় সিটিজেনশিপ অ্যাক্টি-১৯৫৫ এবং সিটিজেনশিপ রুলস-২০০৩ অনুযায়ী। এনপিআরের কাজ সন্দেহজনক নাগরিক চিহ্নিত করা। তাহলে এনপিআরে আধার নম্বর বাধ্যতামূলক কেন? নাগরিকত্বের সঙ্গে বায়োমেট্রিক্সের সম্পর্কটা কী? এনপিআরের সঙ্গে বায়োমেট্রিক্স যোগের কথা সরকার সরকার সংসদেও স্বীকার করে নিয়েছিল। বলা হয়েছিলো কিছু রাজ্যে বায়োমেট্রিক্স সংগ্রহ করবে এনপিআর, কিছু রাজ্যে আধার(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://mha.gov.in/MHA1/Par2017/pdfs/par2014-pdfs/rs-230714/229.pdf&ved=2ahUKEwiwhbLhkZzoAhVNzjgGHWTVCSoQFjABegQIBBAB&usg=AOvVaw3qeUa_w6TWIQNSZ8rGL1xE)। এখন সবার আধার কার্ড করিয়ে সেটাকে এনপিআরে সংযুক্ত করার কারণটা কী? ঠিক কোন খিচুড়িটা পাকানো হচ্ছে? আধারের সঙ্গে মোবাইল নম্বর, আধারের সঙ্গে প্যান, প্যানের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট; এখন ভোটার কার্ডের সঙ্গে আধার যোগ করতে চাইছে কেন্দ্র। আধারে বায়োমেট্রিক্সের মতো ব্যক্তিগত তথ্য থাকে। তাহলে কি এটা প্রত্যেকটা মানুষকে ২৪*৭ রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে আনার চেষ্টা? পরবর্তীতে তো বিষয়টা এমনও হতে পারে যে আধার ধরে এক একটা মানুষকে জাস্ট নেই করে দেওয়া হবে। বায়োমেট্রিক্সের তথ্য সহ এনপিআর; এই বিশাল তথ্যভান্ডার যে আদৌ সুরক্ষিত থাকবে তার কী গ্যারান্টি আছে? আধারের সঙ্গে নাগরিকত্বকে জুড়ে দেওয়ার পর যদি এই বিপুল তথ্যভান্ডারে একজনের বায়োমেট্রিক্স অন্যজনের বায়োমেট্রিক্সের সঙ্গে মিলেমিশে যায় তখন কী হবে? তখন তো বহু মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে। আধারে যে কী ভয়াবহ ভুলত্রুটি এবং গোলমাল হয় আমরা সবাই সেটা দেখেছি। বড়সড় সর্বনাশ হলে দায়টা কে নেবে?
এনপিআর এবং জনগণনা হবে একই সময়ে, একজনই সরকারি আধিকারিক দুটোরই তথ্য নেবেন। ফলে জনগণনা এবং এনপিআর-কে এক বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে। জনগণনার আইনি ভিত্তি সেন্সাস অ্যাক্ট-১৯৪৮(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=http://censusindia.gov.in/2011-Act%26Rules/notifications/Act%2520%26%2520Rules%2520corrected%252029-5-08_doc.pdf&ved=2ahUKEwix04fJ7pzoAhXUxzgGHf4gDikQFjAAegQIBBAB&usg=AOvVaw2sCgI8TQbbpFFtMavlcTtj) আর এনপিআরের আইনি ভিত্তি সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট-১৯৫৫ এবং সিটিজেনশিপ রুলস-২০০৩. এই দুটো বিষয়ের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই। সুতরাং, এই বিষয়ে অন্তত কোনও সন্দেহের অবকাশই থাকে না যে এনপিআর এনআরসি-র প্রথম ধাপ। সঙ্গে যোগ হয়েছে আধার। অনেকে বলবেন এনপিআর তো আগেও হয়েছে। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে আগেও এনপিআর হয়েছে। কিন্তু পূর্বের এনপিআরের সঙ্গে এ বারের এনপিআরের তফাৎ আছে। নতুন অনেক প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে। সর্বোপরি এনআরসি হলে তা ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে পারে; সেটা আসাম আমাদের দেখিয়েছে। সেটা থেকে শিক্ষা নিয়েই এনআরসি-র প্রথম ধাপ এনপিআরের বিরোধিতা করা প্রয়োজন।২০১৮~১৯ সালের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বার্ষিক রিপোর্টেও কথা লেখা আছে এনপিআর এনআরআইসি-র প্রথম ধাপ(চিত্র: ৯)। ২০১৪ সালের ২৩ জুলাই রাজ্যসভাতেও সরকার জানিয়েছিলো যে তারা এনপিআরের তথ্য যাচাই করে এনআরআইসি করতে চায়(চিত্র: ১০)। সুতরাং এনআরসি আটকাতে গেলে এনপিআর আটকাতেই হবে।
আসামের এনআরসি-র একটা অন্য ইতিহাস রয়েছে। আসামে বিদেশীদের তাড়িয়ে দেওয়ার দাবীতে ১৯৭৯ সাল থেকে দীর্ঘকালীন আন্দোলন চলেছে। ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং আসাম আন্দোলনের আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়(তথ্যসূত্র: https://en.m.wikipedia.org/wiki/Assam_Accord)। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন হোম সেক্রেটারি আর.ডি.প্রধান এবং চিফ সেক্রেটারি পি.পি.ত্রিবেদী। আন্দোলনকারীদের তরফে অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি পি.কে.মোহন্ত, সাধারণ সম্পাদক পি.কে.ফুকন এবং অল আসাম গণসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক বিরাজ শর্মা স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিই আসাম একর্ড নামে পরিচিত(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://peacemaker.un.org/sites/peacemaker.un.org/files/IN_850815_Assam%2520Accord.pdf&ved=2ahUKEwi5o5LM05noAhU6wzgGHf4qDg0QFjApegQICBAB&usg=AOvVaw2dQQvd-eiMoD13cMaOhXfD&cshid=1584178859564)। এই চুক্তির অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে প্রধান একটি বিষয় ছিলো বিদেশী চিহ্নিতকরণ এবং বিতাড়ন। অর্থাৎ বিদেশীদের চিহ্নিত করে আসাম থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। আসাম একর্ড স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে ১৯৮৫ সালে নাগরিকত্ব আইনকে সংশোধন করা হয় এবং ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ৬এ ধারা যুক্ত করা হয়; যা শুধুমাত্র আসামের জন্যই প্রযোজ্য(চিত্র: ১১)। যদিও আসাম একর্ডে এনআরসি তৈরির কথা বলা হয়নি।২০০৯ সালে "আসাম পাবলিক ওয়ার্কস" নামে একটি এনজিও সুপ্রিম কোর্টে এনআরসি আপডেট করার আবেদন জানায়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট এনআরসি আপডেট করার নির্দেশ দেয়(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/amp/s/gulfnews.com/amp/world/asia/india/assam-nrc-timeline-through-the-years-1.66124831)। আসামে এনআরসি-র কাট অফ ডেট ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। অর্থাৎ; এনআরসিতে নাম তোলার জন্য আসামের প্রত্যেক মানুষকে প্রমাণ করতে হয়েছে যে তাঁরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে থেকে ভারতবর্ষে আছেন। এই কাট অফ ডেট ঠিক হয় আসাম একর্ড অনুযায়ী; যার ভিত্তিতে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ৬এ ধারা যুক্ত হয়(চিত্র: ১২)। গোটা দেশের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কাট অফ ডেট হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। ভারতের সংবিধানের ৬ নম্বর ধারায় লেখা আছে- যাঁরা ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই থেকে তার পরবর্তীতে যাঁরা ভারতে এসেছেন; তাঁদের প্রত্যেককে আবেদন করে নাগরিকত্ব নিতে হবে(চিত্র: ১৩)। সুতরাং; সংবিধান মেনে ধরে নেওয়া যায় যে গোটা দেশে এনআরসি হলে তার কাট অফ ডেট হবে ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই। কী কী লাগবে এনআরসিতে নাম তুলতে গেলে? আসামের এনআরসিতে নাম তোলার জন্য লিস্ট এ তে উল্লিখিত নিজের অথবা পূর্বপুরুষের ১৪ টি নথিকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। সেগুলি হলো-
১৯৫১ সালের এনআরসি, ২৪ মার্চ; ১৯৭১ পর্যন্ত ভোটার লিস্ট, জমির দলিল, সিটিজেনশিপ সার্টিফিকেট, পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট, রিফিউজি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট, এলআইসি, গভর্নমেন্টের ইস্যু করা লাইসেন্স বা সার্টিফিকেট, গভর্নমেন্ট সার্ভিস/ এমপ্লয়মেন্ট সার্টিফিকেট, ব্যাঙ্ক/ পোস্ট অফিস অ্যাকাউন্ট, বার্থ সার্টিফিকেট, বোর্ড/ ইউনিভার্সিটির এডুকেশনাল সার্টিফিকেট, কোর্ট রেকর্ডস।
যদি লিস্ট এ অর্থাৎ উপরিউক্ত নথিগুলি পূর্বপুরুষের হয়; তাহলে লিস্ট বি তে উল্লিখিত নথিও জমা দিতে হবে। লিস্ট বি তে উল্লিখিত আটটি নথি হলো-
বার্থ সার্টিফিকেট, ল্যান্ড ডকুমেন্ট, বোর্ড/ ইউনিভার্সিটি সার্টিফিকেট, ব্যাঙ্ক/এলআইসি, পোস্ট অফিস রেকর্ড, সার্কেল অফিসার বা জিপি সেক্রেটারির তরফ থেকে বিবাহিতা মহিলাদের দেওয়া সার্টিফিকেট, ভোটার লিস্ট, রেশন কার্ড অথবা আইনত গ্রাহ্য অন্য কোনও কাগজপত্র। (তথ্যসূত্র: http://www.nrcassam.nic.in/admin-documents.html)
মোদ্দা বিষয় হলো আসামের ক্ষেত্রে প্রত্যেককে নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছে যে তিনি বা তাঁর পূর্বপুরুষরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে থেকে আসামের বসবাস করছেন। এই নথিপত্রের তালিকা বারংবার পরিবর্তিত হয়েছে। গোটা ভারতবর্ষে এনআরসি হলে প্রত্যেককে সম্ভাব্য সাংবিধানিক কাট অফ ডেট অর্থাৎ ১৯ জুলাই, ১৯৪৮ সালের আগে থেকে নিজের অথবা তার পূর্বপুরুষের ভারতবর্ষে বসবাসের প্রমাণ দিতে হবে।
এই পশ্চিমবঙ্গে বহু মানুষ স্বাধীনতার পর ওপার বাংলা থেকে এসেছেন। আসামের এনআরসি তালিকা দেখতে দেখা যাবে; এনআরসি ছুট ঊনিশ লক্ষ্য মানুষের মধ্যে চোদ্দ লক্ষ হিন্দু। সেটাই স্বাভাবিক; কারণ স্বাধীনতার পরে ওপার বাংলা থেকে মূলত হিন্দুরাই ভারতে এসেছেন। তাঁদের অনেকের কাছেই নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। বহু প্রান্তিক, গরীব মানুষের কাছে কাগজপত্র নেই। এই বাংলায় বন্যায় প্রতিবছর ঘরবাড়ি ভেসে যায়। কী করে মানুষজন কাগজপত্র দেখিয়ে প্রমাণ করবেন নিজের নাগরিকত্ব? আসামের এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষদের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা। মহিলাদের বিয়ের পরে পদবী পাল্টে যায়, ঠিকানা পাল্টে যায়। ফলে নথিপত্র জমা দিতে গিয়ে তাঁরাই বিপদে পড়েছেন বেশি(তথ্যসূত্র: https://www.thecitizen.in/index.php/en/NewsDetail/index/7/17924/Women-Worst-Victims-of-NRC-Gendered-and-Discriminatory-Nature-of-the-Register-Revealed)। এনআরসি হলে বিপদে পড়বেন বাবা মায়ের পরিচয়হীন ব্যক্তিরা, যৌনকর্মী এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা। কারণ এঁদের সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক থাকে না। আসামে এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ডাক্তার, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী সহ অনেকে। বাদ গিয়েছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের পরিবারও(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/amp/s/www.indiatoday.in/amp/india/story/former-president-fakhruddin-ali-ahmed-family-again-left-out-of-nrc-list-1594188-2019-09-01)। সমস্ত নথি দেখিয়েও বাদ পড়েছেন অনেকে। ১৫ টি নথি দেখিয়েও এক মহিলা প্রমাণ করতে পারেননি যে তিনি ভারতের নাগরিক(তথ্যসূত্র: https://www.ndtv.com/india-news/declared-foreigner-assam-womans-story-predicts-citizenship-list-effect-2182212)। এনআরসি-তে যাঁরা বাদ পড়েছেন; তাঁদের ১২০ দিনের মধ্যে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁরা ভারতের নাগরিক(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/amp/s/www.thehindu.com/news/national/over-19-lakh-excluded-from-assams-final-nrc/article29307099.ece/amp/)। ফরেনার্স ট্রাইবুনালে যেতে হাজার হাজার টাকাটা লাগে। সবথেকে বেশি বাদ পড়েছেন গরীব মানুষরা। কোর্ট কাছারি করতে করতে আজকে তাঁদের জীবন কার্যত নরকে পরিণত হয়েছে। কী করে প্রমাণ করবেন তাঁরা নিজেদের নাগরিকত্ব? মানুষের এই চূড়ান্ত কষ্ট এবং হয়রানির দায় কে নেবেন? নরেন্দ্র মোদী না অমিত শাহ? বারবার করে বিজেপির তরফে বলে যাওয়া হচ্ছে ভোটার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে বলেছেন যে ভোটার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়(তথ্যসূত্র: https://youtu.be/eNd792HSl_A)। অথচ ভারতের সংবিধানের ৩২৬ নম্বর ধারায় পরিষ্কার করে লেখা রয়েছে যে ভারতে কেউ ভোটার হতে গেলে তাকে আঠারো বছরের বেশি বয়স্ক হতে হবে এবং ভারতের নাগরিক হতে হবে(চিত্র: ১৪)। "দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অফ দ্য পিপলস অ্যাক্ট-১৯৫০" এর ১৬(১) ধারায় বলা হয়েছে যে শুধু ভারতের নাগরিকদেরই ভোটার তালিকায় নাম থাকতে পারে(চিত্র: ১৫)। ২৩.০৪.২০১৫ তে সংসদের "Unstarred Question No- 4920" র উত্তরে এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী এফিডেভিট করে জানিয়েছেন যে ২০১৪ সালের ভোটার তালিকায় কোনও বিদেশীর নাম নেই (তথ্যসূত্র: সংসদীয় যৌথ কমিটির রিপোর্ট, পৃষ্ঠা-১১০,১১১; চিত্র ১৬, ১৭)। তাই যাঁরা ভোটার; তাঁরা অবশ্যই ভারতের নাগরিক। সংবিধান সেটাই বলে। আর ভোটার কার্ড যদি বৈধ নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়; তবে অবৈধ নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত সরকারও অবৈধ বলে গণ্য হওয়া উচিৎ।
এনআরসি এবং তার প্রথম ধাপ এনপিআর করার কোনও বাস্তবিক প্রয়োজনীয়তা নেই। যতই মানুষের কানে কানে অবৈধ অনুপ্রবেশের গল্প শোনানো হোক না কেন; জনগণনা থেকে প্রাপ্ত কোনও তথ্য অনুপ্রবেশ তত্ত্বকে সমর্থন করে না। যদি সত্যিই বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে হু হু করে অনুপ্রবেশ ঘটতো; তাহলে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি হতো। কিন্তু জনগণনার তথ্য বলছে পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক কম; শুধু তাই নয় গুজরাটের মতো রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় হারের থেকে অনেক বেশি(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/amp/s/eisamay.indiatimes.com/editorial/post-editorial/post-editorial-on-citizenship-amendment-act/amp_articleshow/73981400.cms)। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী আরা ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিলো ১৭.৬৪%. বিহারের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২৫.০৭%, ছত্তীসগড়ের ২২.৬০%, রাজস্থানের ২১.৪০%, উত্তরপ্রদেশের ২০.১০%, মধ্যপ্রদেশের ২০.৩০%। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিলো ১৩.৯৩%, আসামে ১৬.৯০%. অর্থাৎ অনুপ্রবেশের তত্ত্ব শুধুই মাত্র হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির ফরওয়ার্ড করা মেসেজ এবং আইটি সেলের ফেসবুক পোস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর যদি তর্কের খাতিরে এও ধরে নেওয়া হয় যে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে ভারতে ঢুকে অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছে; জনগণনার তথ্য সেই বক্তব্যকেও সমর্থন করে না। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে সবথেকে বেশি বাঙালি থাকে পাঁচটি রাজ্যে। গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক দিল্লী এবং উত্তরপ্রদেশ। এই চারটি রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বাঙালিদের অবদান যথাক্রমে ০.৩৯%, ০.৮৫%,০.৫৬%, ০.২৫% এবং ০.১৭%.(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/amp/s/eisamay.indiatimes.com/editorial/post-editorial/post-editorial-on-infiltration/amp_articleshow/74590772.cms) সর্বোপরি, এক দেশ থেকে অবৈধ ভাবে অন্য দেশে যাওয়া মানুষদের অধিকাংশই পরিযায়ী শ্রমিক। কাজের সন্ধানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যান। অর্থাৎ, অনুপ্রবেশের মূল কারণটা যে অর্থনৈতিক; এটা বুঝে নেওয়া দরকার। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রভূত উন্নতি হয়েছে। ফলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই কমেছে অনুপ্রবেশ।
সুতরাং, কোনও অঙ্কতেই বিপুল অনুপ্রবেশের তত্ত্ব মেলানো যায় না। এমনকি বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন কিছু এলাকায় বারবার মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। বিষয় হলো; যে সমস্ত জেলায় জনসংখ্যার হার বেশি; সেখানে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে জনসংখ্যার হার বেশি; যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম; সেখানে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে কম। (তথ্যসূত্র: https://www.google.com/amp/s/www.anandabazar.com/amp/editorial/%25E0%25A6%2585%25E0%25A6%25A8-%25E0%25A6%25AA-%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25AC-%25E0%25A6%25B6-%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25A4-%25E0%25A6%25A4-%25E0%25A6%25AC-%25E0%25A6%2586%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25B2-%25E0%25A6%25A7-%25E0%25A6%25AA-%25E0%25A6%25AA-%25E0%25A6%25AC-%25E0%25A6%259C-1.205663)। যতটুকু অনুপ্রবেশ হচ্ছে; সেটা আটকানোর জন্য বিএসএফ রয়েছে, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে নিজের দেশে ফেরৎ পাঠানোর জন্য পাসপোর্ট অ্যাক্ট ১৯২০, ফরেনার্স অ্যাক্ট ১৯৪৬ এর মতো শক্ত আইন রয়েছে। সেই সব কিছু থাকা সত্ত্বেও অনুপ্রবেশের ধুয়ো তুলে এনআরসি করতে চাওয়া আসলে মানুষের মূল সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে তাকে নাগরিকত্বের প্রশ্নে ব্যস্ত করে তোলা। ফিসফিস করে আরেকটা প্রচার চলে- মুসলিমরা বেশি অপরাধপ্রবণ হয়। এই কথারও কোনও বাস্তবিক ভিত্তি নেই।
আরও একটি প্রচার চলে। দলে দলে মুসলিমরা ঢুকে সব চাকরি বাকরি খেয়ে নিচ্ছে। অনুপ্রবেশের তত্ত্ব যে কতটা ভুয়ো; সেটা আগেই প্রমাণিত। কিন্তু মুসলিমরা সত্যিই প্রচুর চাকরি পাচ্ছে? ২০০৫ সালে গঠিত হওয়া উচ্চপর্যায়ের সাচার কমিটির রিপোর্ট ঠিক তার উল্টো কথা বলেছিলো(তথ্যসূত্র: https://drive.google.com/file/d/1KlbF64TQ9EfR2uO0LdZbmie_QQ2YBLMp/view?usp=drivesdk)। ওই রিপোর্টে দেখা গিয়েছিলো ভারতে মুসলিমদের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা এসসি, এসটি-দের থেকেও খারাপ। সরকারি এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে "রেগুলার ওয়ার্কার"দের মধ্যে জনসংখ্যার শতাংশের ভিত্তিতে মুসলিমদের যোগদান সবথেকে কম(চিত্র: ১৮)। "পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম তোষণ হয়"- এই কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। কী রকম তোষণ হয়? আসুন একটু জেনে নিই। ২০১১ সালের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা ২৭% মতো। খুব স্বাভাবিক ভাবেই সরকারি এবং বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুসলিমদের যোগদান ২৭% এর আশেপাশে হওয়া উচিৎ। কিন্তু তথ্য কী বলছে? পশ্চিমবঙ্গে ৩৩১২৪৯ জন সরকারি কর্মচারীর মধ্যে ১৮৯৯১ জন মুসলমান। অর্থাৎ সরকারি কর্মচারী মধ্যে মুসলিমদের যোগদান ৫.৭৩%. সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে তৎকালীন গ্রুপ এ এবং গ্রুপ বি সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের যোগদান ছিলো ৪.৭%, গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি-র ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান ২.১%(তথ্যসূত্র: https://www.google.com/amp/s/www.thehindu.com/news/cities/kolkata/Bengal-records-more-Muslims-in-govt.-jobs/article16439342.ece/amp/)। ভয়াবহ তোষণ হচ্ছে না? হিন্দুরা বিপদে তো এই তোষণের জন্য। এইজন্যই তো এনআরসি দরকার।
অনেকে বলবেন সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় দুর্নীতিপরায়ণ হন। ফলে অনেক সময়েই তাঁরা ঘুষ নিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেন। সত্যিই যদি তাই হয়; তবে তাঁদের কাছে প্রশ্ন- দেশজুড়ে এনআরসি প্রক্রিয়াটা কারা করবেন? সেই সমস্ত সরকারি কর্মচারীরাই করবেন। সরকারি কর্মচারীদের কথা যখন উঠলোই; তখন আসামের এনআরসি প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মচারীদের কাজের মূল্যায়ন হয়েছে সেটা বলা দরকার। ফরেনার্স ট্রাইবুনালের অ্যাডভোকেট; যাঁদের "মেম্বার" বলা হয়; তাঁদের কাজের মূল্যায়ন হয় তাঁরা কতো মানুষকে বিদেশী ঘোষণা করেছেন তার ওপর। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে "মেম্বার" যত বেশি মানুষকে বিদেশী ঘোষণা করতে পেরেছেন; সেই "মেম্বারে"র কাজ সরকারি নথিতে তত বেশি প্রশংসিত হয়েছে(চিত্র: ১৯, ২০)। অর্থাৎ; বেশি বেশি সংখ্যায় মানুষকে রাষ্ট্রহীন করলেই কাজের জায়গায় তাঁদের সুনাম। আজ বাদে কাল কাজের জায়গায় সুনামের জন্য আমি বাঁ আপনি যে বাদ পড়ে যাবো না; এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবেন কি?
এবার আসা যাক এনআরসি-র অর্থনৈতিক প্রভাবের দিকে। আসামের মতো একটা মাঝারি মাপের রাজ্যে এনআরসি করতে খরচ হয়েছে ১৬০০ কোটি টাকা। গোটা ভারতে এনআরসি হলে মোটামুটি এর ৪০ গুণ খরচা হবে; অর্থাৎ আনুমানিক ৬৪০০০ কোটি টাকা খরচা হবে। জনগণের টাকার শ্রাদ্ধ করে জনগণকে বিপদে ফেলার কারণ কী? নাগরিকত্বের অধিকার মূল অধিকার। কেউ নাগরিক হলে তবেই সে বাকি সাংবিধানিক অধিকার পাবে। গোটা দেশে যখন গণতন্ত্রের ওপর আঘাত নেমে আসছে; তখন খুব সচেতন ভাবে নাগরিক অধিকার হরণের লক্ষ্যেই এই এনআরসি, এনপিআরের অবতারণা। মানুষের সমস্ত অধিকার হরণ করে তাদের বিনা পয়সার মজুর বানানোর চক্রান্ত এই এনআরসি, এনপিআর। দেশের শ্রমিক, কৃষকদের ওপর যতই অত্যাচার হোক না কেন; শেষত তাঁরা নাগরিক। ফলে কোথাও গিয়ে রাষ্ট্রের একটা দায়বদ্ধতা থেকে যায়। সেই দায়বদ্ধতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নাগরিকত্ব বিহীন বিনা পয়সার মজুরে পরিণত করাই এনআরসি-র লক্ষ্য। একইসঙ্গে বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের মেরুকরণের রাজনীতির বিপুল সুবিধা হবে এই এনআরসিতে। একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি ছড়ানো ঘৃণার ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে তাদের রাজনীতি। সেই কারণেই এনপিআর, এনআরসি-র মানুষ মারা পদক্ষেপ গ্রহণ। আর ঠিক এই কারণেই যে কোনও মূল্যে এনপিআর, এনআরসি-কে প্রতিহত করা দরকার।